অধ্যক্ষ এম এ হামিদের মৃত্যু বার্ষিকীতে স্মরণসভা ও দোয়া অনুষ্ঠান

0
63

স্টাফ রিপোর্টার: চলনবিলের কিংবদন্তি, বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী, লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল হামিদের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মরণসভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল এই স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো: আব্দুল কুদ্দুস। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রহীম, সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট লেখক সমর পাল, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক বীর মুক্তিযোদ্ধা, ডাঃ সিরাজুল ইসলাম শিশির, বিমানবন্দরের সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা শরিফুল আলম, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার মোকাদ্দেস হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জালাল উদ্দিন, শহিদ বুলবুল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিবজিৎ নাগ, আলফা ক্রেডিট রেটিং লিঃ এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মান্নান, নাটোর জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট লোকমান হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, খুবজীপুর এম হক কলেজের অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম, খুবজীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসানা আকতার শিলা, মরহুম আব্দুল হামিদের কন্যা জিনাত আরা, চলনবিল প্রবাহের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুল হক খোকন প্রমুখ।

প্রধান অতিথি অধ্যাপক মোঃ আব্দুল কুদ্দুস এমপি অধ্যক্ষ আঃ হামিদকে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন অধ্যক্ষ আঃ হামিদ ছিলেন চলনবিলের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ, একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি একাধারে ছিলেন শিক্ষক, সমাজসেবক, লেখক, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, সংগঠক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। একজন মানুষের মাঝে এত মানবিক গুণাবলির সংমিশ্রণ খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। অধ্যক্ষ হামিদের পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হামিদ ভাই ছিলেন তার আপন বড় ভাইয়ের মত। তিনি যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে খুবজীপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হন তখন এক বছর হামিদ সাহেবের বাড়িতে থাকতেন। পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি সব সময় উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিতেন। পড়াশোনার ব্যাপারে সব সময় খোঁজ খবর নিতেন। জাতীয় পর্যায়ে অধ্যক্ষ হামিদ সাহেবের অবদান ও পরিচয় তুলে ধরার ব্যাপারে তিনি বলেন তিনি বেশ আগেই প্রধানমন্ত্রীকে  হামিদ সাহেবের ব্যাপারে বলেছেন। জাতীয় পর্যায়ে যাতে তাকে স্বীকৃতি বা পুরস্কার দেয়া হয় তার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। তিনি আবারও বিষয়টি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন। আগামী ২১ শে পদক ঘোষণার আগে তার বিষয়টি নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন। তিনি আগামী প্রজন্মকে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের বর্ণাঢ্য ও কর্মময়  জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহবান জানান। তিনি তার স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ফাউন্ডেশন করার প্রস্তাব সমর্থন করেন।

আলোচনায় অংশ গ্রহণ করে অধ্যক্ষ হামিদের অনুজ ও  প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক বীর মুক্তিযোদ্ধা  ডাঃ সিরাজুল ইসলাম শিশির বলেন তার ভাই সব সময় বলতেন, “যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই পাইলেও পাইতে পারো মানিক রতন”। তিনি সব সময় শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিতেন।তিনি বলতেন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে কোন ভালো কিছু করা যাবেনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে তার পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন বঙ্গবন্ধু তাকে চিনতেন। তার সাথে যোগাযোগ ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তিনি  হামিদ সাহেবের লেখা বইগুলো তাকে উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন। জাতীয় পত্র পত্রিকায় হামিদ সাহেবের কর্মময় জীবন তুলে ধরে সবাইকে লেখা লেখির অনুরোধ করেন।  দেশের মানুষ যাতে তাকে চিনতে ও জানতে পারে। তিনি তার ভাইকে ২১শে পদকে ভূষিত করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেন।।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আবদুর রহীম বলেন,  হামিদ ভাইয়ের আব্বার সাথে তার আব্বার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। হামিদ সাহেবকে তিনি ভাইজান বলে সম্বোধন করতেন। তিনি তাদের কাছিকাটা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। আমার পড়াশোনার বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর রাখতেন এবং উপদেশ দিতেন। চলনবিলের ইতিকথা বইটি প্রসঙ্গে প্রকৌশলী আবদুর রহীম বলেন, বইটি প্রকাশের আগে চলনবিলের নানা জায়গার  তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে অধ্যক্ষ হামিদ চলনবিলের প্রত্যন্ত গ্রামে গঞ্জে সরেজমিনে ঘুরতে যেতেন। একবার তার সুযোগ হয়েছিল এই তথ্য সংগ্রহের কাজে হামিদ সাহেবের সাথে যাওয়ার। সেবার তারা পাবনা থেকে বড়ালব্রীজ নেমে হান্ডিয়াল গ্রামে গিয়েছিলেন চলনবিলের ইতিকথা’র মাল মশলা সংগ্রহ করার জন্য।

সাবেক সচিব, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক সদস্য ও লেখক সমর পাল বলেন চাকরি জীবনের প্রথম দিকে তিনি বগুড়ায় ছিলেন। তখন হামিদ সাহেব বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। বগুড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো এবং তিনি সব অনুষ্ঠানে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য প্রদান করতেন। তিনি বলেন আমি চাঁচকৈড় বিয়ে করার পর আমাকে আত্মীয়তার সূত্রে নাতজামাই বলে সব সময় সম্বোধন করতেন। তিনি তার লেখা সব বই এককপি করে আমাকে উপহার হিসেবে প্রদান করতেন। তিনি চলনবিলের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে যেভাবে এই বইটি লিখেছেন তা বিরল ঘটনা।  এখন আর কেউ এভাবে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে বই লিখে না। অনুমান নির্ভর করে এখনকার  লেখকরা বই লিখেন।সমর পাল আরো বলেন  চলনবিলের ইতিকথা বই থেকে তিনি সারা জীবন নানা ধরনের তথ্য উপাত্ত দেখে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন হামিদ সাহেব ছিলেন একজন মানবতাবাদী লেখক ও সমাজ সেবক।  আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের মেয়ে জিনাত আরা বলেন তার বাবা যখন রাস্তা দিয়ে হাটতেন তখন পরিচিত অপরিচিত সবাই তাকে সালাম দিতেন। বাবার প্রতি মানুষের এই শ্রদ্ধাবোধ দেখে তারও বাবার মত একজন মানুষ হবার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বলেন তার বাবা মানুষকে খাওয়াতে খুব পছন্দ করতেন। মেহমান ছাড়া তিনি খেতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন না। তিনি ফলমূল খেতে পছন্দ করতেন। ঝাল তরকারি একদম খেতে পারতেন না। কখনো যদি একটু ঝাল হতো তিনি সেই খাবার খেতে গিয়ে ঘেমে যেতেন। ঘাম মুছতেন আর বলতেন “তোমার মা আমাকে বেশি ভালোবাসেনতো তাই ঘামছি”।  এরকম ঠাট্টামূলক কথাও তিনি মার সামনে বলে লজ্জা দিতেন। কোন অফিসে বা কানে কোথাও গেলে যদি কেউ জানত আমরা হামিদ সাহেবের মেয়ে তাহলে সবাই আগে তাদের কাজ করে দিতেন। তার বাবার কথা কেউ শুনলে সবাই তাদের সমীহ করতেন। তিনি আরও বলেন তার আব্বার ধ্যান জ্ঞান ছিল মানুষের উপকার করা। এমনও দেখা গেছে কোন শাক বিক্রেতা বা মাছ বিক্রেতা তাদের জিনিস বিক্রি করতে পারছেনা বাবা তাদের এই কষ্ট দেখে সেই মাছ বা শাক কিনে আনতেন। এভাবে তিনি সব সময় চেষ্টা করতেন মানুষের সেবা করার।  তিনি সব সময় বই পড়তেন ও লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকতেন। বাবার বই আমাদের পড়তে দেখলে বাবা খুব খুশি হতেন। এ জন্য আব্বাকে খুশি করার জন্য আমরা তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তার লেখা বই পড়তাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম অধ্যক্ষ আঃ হামিদের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার সৌভাগ্য যে মামা যে বিভাগের ছাত্র ছিলেন আমিও সেই একই বিভাগের ছাত্র এবং বর্তমানে শিক্ষক। তিনি বলেন, প্রথম বিভাগ না পেলেও অধ্যক্ষ হামিদ  রসায়ন বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি ইচ্ছে করলে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যেতে পারতেন কিন্ত তিনি দেশের মানুষের সেবা করার জন্য দেশেই থেকে যান। তার মত এমন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি আজকের সমাজে দূর্লভ।

খুবজীপুর এম হক কলেজের অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা অধ্যক্ষ হামিদ সাহেবের স্মৃতিচারণ করে বলেন হামিদ ভাই ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ  চিন্তা চেতনার মানুষ। তিনি সকল ধর্মের মানুষকে পছন্দ করতেন। সব ধর্মের মানুষের সাথে ছিল তার বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তা। রাস্তা ঘাটে, বাসে ট্রেনে চলতে ফিরতে যেকোন মানুষের সাথে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধুত্ব করে ফেলতেন। তাদের আপন করে নিতেন। তাদের নাম ঠিকানা লিখে রাখতেন। বিদেশি কাউকে দেখলে নিজে আগ্রহী হয়ে সম্ভাষণ জানাতেন এবং পরিচয় হতেন। হিন্দু খ্রিস্টান বৌদ্ধ সবার সাথেই ছিল তার সুসম্পর্ক।  তিনি ছিলেন একজন মানবতাবাদী মানুষ।

আলোচনায় অংশ গ্রহণ করে আলফা ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মান্নান বলেন, অধ্যক্ষ আঃ হামিদের সাথে তার প্রথম পরিচয় রাজশাহীতে। এরপর ১৯৯০ সালে   জাতীয় যাদুঘরে তাকে নাটোরবাসীদের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।  এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন।সভাপতি ছিলেন প্রকৌশলী আবদুর রহীম।  সে সময় একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। এর সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মান্নান।  এরপর থেকেই তার সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। অধ্যক্ষ আঃ হামিদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তিনি তার নামে একটি ফাউন্ডেশন করার প্রস্তাব করেন।

পাবনা শহিদ বুলবুল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিবনিৎ নাগ বলেন, হামিদ স্যার ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। ১৯৫৬ সালের জুলাই থেকে সাড়ে তের বছর তিনি এডওয়ার্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের সহঃ অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ক্লাশে খুব মজা করতেন। রসায়নের তেলেশমাতি তিনি ক্লাশে দেখাতেন।দেখা যেত অনেক সময় রঙ বানিয়ে তিনি ছাত্রছাত্রীদের গায়ে ছুঁড়ে দিতেন। কিছু সময় পর সেই  রঙ হারিয়ে যেত।  এভাবে শ্রেণি কক্ষে হাস্য রসাত্বক পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। অধ্যাপক শিবজিৎ নাগ বলেন তিনি প্রচুর চিঠি লিখতেন। দিনের বেলা সময় পেতেন না বলে রাতের বেলা পোস্ট অফিসে যেতেন। এ জন্য কর্তৃপক্ষকে বলে তিনি রাত্রিকালীন পোস্ট অফিস খোলা রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহঃ অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম বলেন অধ্যক্ষ আঃ হামিদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৬ টি। তার মধ্যে সব চেয়ে বেশি আলোচিত ও জনপ্রিয় বই হচ্ছে চলনবিলের ইতিকথা। এছাড়া চলনবিলের লোকসাহিত্য একটি বিখ্যাত বই। লেখক ও গবেষকদের কাছে বই দুটির খুব চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া ‘দেখে এলাম অষ্ট্রেলিয়া ‘ ‘পাশ্চাত্যের বৈশিষ্ট্য ‘ ‘কর্মবীর সেরাজুল হক’  ‘শিক্ষার মশালবাহী রবিউল করিম’ , ‘জ্ঞানের মশাল’ প্রভৃতি বইগুলো তার অসামান্য কীর্তির সাক্ষর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জালাল উদ্দিন বলেন হামিদ ভাই ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা থেকেই তার নাম শুনে আসছিলেন। হামিদ সাহেবের  নামের আগে ‘অধ্যাপক’ ছিল বলে তিনিও বড় হয়ে অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বলেন তার সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৬১/৬২ সালের দিকে। শিকারপুর মাদ্রাসার জালসা উপলক্ষে তারা ছোট বেলা গ্রামে গঞ্জে টাকা পয়সা কালেকশনে যেতেন। তখন টিনের চোঙ্গায় অতিথি হিসেবে অধ্যাপক হামিদ সাহেবের নাম বলে প্রচার করতেন। অধ্যাপক জালাল উদ্দিন আরও বলেন একবার রাজশাহীতে মাওলানা ভাসানীর কাছে তাকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে ছিলেন। একবার নাটোর থেকে চাঁচকৈড় পর্যন্ত গহনার নৌকা করে দুজন এসেছিলেন। সারারাত হামিদ ভাই তার সাথে গল্প করতে করতে এসেছিলেন। চাঁচকৈড় নেমে হামিদ সাহেব মিষ্টি কিনে তাকে নিয়ে তার ছোট মাকে প্রথম বারের মত দেখতে গিয়েছিলেন।

জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ও মরহুম আব্দুল হামিদের অনুজ এস এম শরিফুল আলম বলেন তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তখন তাকে এবং তার আরেক ভাই সিরাজকে নিয়ে হামিদ সাহেব  পাবনা চলে যান।উদ্দেশ্য ছিল শহরে গেলে ভালো পড়াশোনা হবে। গ্রামে থাকলে পড়াশোনা ভালো হবে না বলে তাদেরকে নিয়ে নিজের বাসায় রাখেন। তাদের পড়াশোনার ব্যাপারে সব সময় উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিতেন।  তিনি বলেন হামিদ ভাই অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তাদেরকে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বলতেন। পরবর্তীতে তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে মহসিন হলে থাকতেন তখন তার ভাই মাঝে মাঝে হলে যেতেন। আসার সময় তার পকেটে সব সময় কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে আসতেন। যদিও তিনি ভাইয়ের অবস্থা চিন্তা করে টাকা নিতে চাইতেন না। কিন্ত তারপরও জোর করে টাকা দিয়ে আসতেন। তিনি বলেন তার ভাই সারাজীবন মানুষের সেবা করে গেছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইদুর রহমান তার স্বাগত বক্ত্যবে বলেন অধ্যক্ষ হামিদ স্যারকে তিনি হামিদ ভাই বলে সম্বোধন করতেন।  হামিদ ভাই সম্পর্কে অনেক কবি, সাহিত্যিক অনেক  মূল্যবান  মন্তব্য করেছেন। লেখক সানাউল্লাহ নুরী, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁসহ অনেকের বক্তব্য তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন আমরা যদি হামিদ সাহেবের আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে না  পারি তাহলে আজকের এই স্মরণসভা সফল হবে না। এ জন্য আমাদের হামিদ সাহেবের শিক্ষাগুলো আমরা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব। তিনি বলেন হামিদ ভাই সময় বাঁচানোর জন্য সব সময় রাতে ভ্রমণ করতেন। সারাদিন তিনি ব্যস্ত থাকতেন তার কাজকর্ম নিয়ে। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি সবার চিঠির জবাব দিয়ে ঘুমাতেন। তিনি আরও বলেন তিনি ছিলেন অতিথিবৎসল। কোনদিন কেউ তার বাসা থেকে না খেয়ে আসতে পারতেন না।  মানুষকে খাওয়াতে তিনি খুব পছন্দ করতেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাপ্তাহিক চলনবিল প্রবাহ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুল হক খোকন বলেন অধ্যক্ষ আঃ হামিদ ছিলেন একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী এবং একজন সাংবাদিক।  তিনি অধ্যাপক মোঃ আব্দুল হামিদের সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত মাওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এবং হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে লাহোর থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক, দি লাইট পত্রিকার গ্রাহক হন। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত পল্লীবান্ধব ও নয়া জামানা এবং কোলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদে প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র লিখতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি সাপ্তাহিক সৈনিক, জাহানে নও, দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ, মিল্লাত প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতেন। ১৯৬৭- ৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক পয়গাম পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৫৮ সাল থেকে আমাদের দেশ নামে একটি মাসিক পত্রিকা পাবনা থেকে প্রকাশ করতেন।

মরহুম আব্দুল হামিদের অনুজ, ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটির ডেপুটি রেজিষ্ট্রার ও জনসংযোগ কর্মকর্তা  এস এম মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ ভার্চুয়াল স্মরণ  সভায় আলোচনা শেষে মরহুম অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন তার ছোট ভাই, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ সিরাজুল ইসলাম।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে