অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানী: প্রজাদের মহারাণী

0
165

 

মোছাঃ শাপলা খাতুন:  ভারতীয় ইতিহাসের যুগবিভাজনে সময়টা মধ্যযুগ। বাংলা তখন ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা, মুঘল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। আর বাংলার প্রাণকেন্দ্র ছিল নাটোর। নাটোরের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছিল সুবাদার মুর্শিদ কুলী খানের সময়ে (১৭০১-১৭২৭)। নবাবের অনুমতি নিয়ে এ সময়ে বরেন্দ্র বাহ্মণ রঘুনন্দন তার কনিষ্ঠ ভাই রামজীবনের নামে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। রামজীবনই ছিল নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। আর এ রাজবংশ তার গৌরব ও প্রতিপত্তির স্বর্ণশেখরে পৌঁছেছিল এক মহিয়সী রমনীর হাত ধরে। যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অর্ধবঙ্গেশ্বরী  হিসেবে। তার প্রজাহিতৈষীতার কথা ছিল সর্বজন বিদিত। প্রজাদরদি এ শাসককে রাজ্যের প্রজাসাধারণ ডাকতেন মহারাণী বলে। বলছি নাটোরের রাণী ভবানীর কথা। রাজা রামজীবনের কোন সন্তান ছিল না। তাই তিনি দত্তক নিয়েছিলেন রামকান্তকে। নিজ পুত্র স্নেহে বড় করেন তাকে। রাজা রামজীবন তার এই পুত্রকে বিয়ে দিয়েছিলেন জমিদার আত্মরাম চৌধুরীর কন্যা রাণী ভবানীর সাথে। রাণী ভবানী দেখতে যেমন সুন্দরী ছিলেন তেমনি ছিলেন বুদ্ধিমতি। রাণী হলেও তিনি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন ঐশ্বর্যের অহংকার তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না। রাজা রামজীবনের মৃত্যু হয় ১৭৩০ সালে। তার মৃত্যুর পর পিতৃস্থলে আবিষ্ঠ হন রাজা রামকান্ত। তবে রামকান্ত রাজা হলেও অভিভাবক হিসেবে রাজকার্য পরিচালনা করতেন দয়ারাম। ১৭৪৮ সালে রামকান্তের মৃত্যু হয়। রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলীবর্দী খাঁ নাটোর জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব দেন রাণী ভবানীকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৮০২ সাল পর্যন্ত মোট ৪৪ বছর তিনি রাজ্য পরিচালনা করেন। রাণী ভবানীর শাসনামলে তার রাজ্যের সীমানা অনেক বৃদ্ধি পায়। বর্তমান সময়ের পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলা তার রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সমগ্র বাংলা যে ১৩ টি চাকলায় বিভক্ত ছিল তার ৮টিই ছিল রানী ভাবনীর রাজ্যভুক্ত। যেখানে নবাবের কোষাগারের প্রকৃত রাজস্ব ছিল প্রায় দেড় কোটি সিক্কা রুপি সেখানে শুধুমাত্র রাণী ভবানীর জমিদারী থেকেই আসতো বার্ষিক ৭০ লক্ষ সিক্কা রুপি। তার রাজ্যের এই বিশালতার জন্যই তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন অর্ধবঙ্গেশ্বরী হিসেবে। ১৭৭৯ সালে মেজর রেনেল ‘বেঙ্গল এ্যাটলাস’ নামে বঙ্গদেশের মানচিত্র প্রকাশ করেন। সেই মানচিত্রে তার রাজ্যের পরিমান ১২,৯৯৯ বর্গমাইল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাণী ভবানী একদিকে যেমন দৃঢ় হস্তে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন অপরদিকে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থা,কৃষি উন্নয়ন ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। ও ম্যালি (O’ Malley) রাজশাহী গেজেটে উল্লেখ করেন,‘ রাণী প্রায় ৩৮০ টি প্রার্থনালয়, অতিথিশালা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির স্থাপন করেন।’ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও রাণী ছিলেন বেশ মনোযোগী। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ‘রানী ভবানীর জাঙ্গাল’ নামক রাস্তা নির্মাণে যাবতীয় ব্যয়ভার তিনি বহন করেছিলেন। এ রাস্তাটি নাটোর হতে বগুড়ার ভাওয়ালিপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হাওরা থেকে কাশি পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাও তিনিই তৈরি করেছিলেন যেটি ‘রাণী ভবানী রোড ’ নামে পরিচিত ছিল। এখন এটি বোম্বে রোডের অংশ। কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেও তিনি ছিলেন বেশ যত্নশীল । তৎকালীন নাটোরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো নারদ নদ। নদের পানিকে সেচকার্যে লাগানোর জন্য তিনি অনেক খাল খনন করেছিলেন। এছাড়া খাবার পানির সংকট দূর করার জন্য তিনি অনেক পুকুরও খনন করেছিলেন। তার প্রজাহিতৈষী মনোভাবের কারণে তার রাজ্যের উন্নয়ন যেমন ঘটেছিল তেমনি প্রজারাও নিরাপদ, সুখী জীবনযাপন করতো। ১৮০২ সালে প্রজাদরদি এ শাসক মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুপর তার দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণ রাজ্যভার গ্রহণ করেন। নাটোর জেলার প্রতিটি স্থানই রাণী ভবানীর স্মৃতি বিজড়িত। তার রাজবাড়ি আজও তার স্মৃতি ধারণ করে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আজও তার কথাই জানান দিচ্ছে।

লেখকঃ এমফিল গবেষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে