আলাউদ্দীন আলীকে ছেড়ে বাংলাসঙ্গীত এক বছর

0
129

ফাত্তাহ তানভীর রানা:

‘একবার যদি কেউ ভালবাসতো, আমার নয়ন দুটি জলে ভাসতো, আর ভালোবাসতো।’ আমি যখন সৈয়দ আব্দুল হাদী’র কণ্ঠে এই গান রেডিওতে শুনেছি, তখন বুঝিনি গানটির ভাবের গভীরতা। যখন বুঝলাম তখন ভাবলাম আহা, কি গান! এমন গান বাংলাদেশে, কে সেই বিখ্যাত সুরকার? গানের সুর অনেকেই করেন, কারো কারো সুরের গান দেশ-কাল-সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন ও কালজয়ী হয়ে যায়। যিনি সুর করেন তাঁকে সুরকার বলা হয়, গানের সুর যদি শিল্পের পর্যায়ে পড়ে তখন সেই সুরকারকে সুরশিল্পী, সুরস্রষ্টা বলা হয়। প্রয়াত সুরকার, সংগীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী একজন সুরস্রষ্টা ছিলেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন নির্মিত সিনেমায় আলাউদ্দীন আলীর সুর ও সংগীত আয়োজনে সৈয়দ আব্দুল হাদী, সাবিনা ইয়াসমিন গান গাইলেই সেই সময় গানটি সাধারণত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতো। আলাউদ্দীন আলী নিজ কর্ম গুণেই হয়েছেন স্মরণীয়। ২০২০ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান, কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রুকিশোর, সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী। একই বছরে আমাদের সংগীতজগতে বারবার আঘাত! কালজয়ী মানুষদের এভাবে চলে যাওয়া আমাদের সংগীতাঙ্গনে গভীর শূণ্যতা সৃষ্টি করলো।

আলাউদ্দীন আলী ১৯৫২ সালে বৃহত্তর ঢাকার মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর বাঁশবাড়ী গ্রামে এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতা ওস্তাদ জাভেদ আলী ও ছোট চাচা ওস্তাদ সাদেক আলীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি গ্রহণ করেন। তিনি ছেলেবেলায় বেহালা বাজানোর জন্য অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলেন। আলাউদ্দীন আলীর প্রয়াত স্ত্রী নজরুল সংগীত শিল্পী সালমা সুলতানা, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিমি আলাউদ্দীনও একজন আধুনিক গানের শিল্পী। তাঁর মেয়ে আলিফ আলাউদ্দিন একজন কণ্ঠশিল্পী। সংগীত শিল্পী আবিদা সুলতানা তাঁর স্ত্রীর ছোট বোন আর সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন তাঁর স্ত্রীর ছোট ভাই। সংগীত পরিচালক আলী আকবর রূপু আলাউদ্দীন আলীর বড় বোনের ছেলে।

আলাউদ্দীন আলী মূলত বেহালা বাদক ছিলেন। তিনি ষাটের দশকে বেহালা বাদক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন, এছাড়াও টেলিভিশন ও বেতারে সুরকার হিসেবে নিয়মিত ছিলেন। ‘ও আমার বাংলা মা তোর’…. লিনু বিল্লাহ ও পরে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া এই গানটি তাঁর টেলিভিশনের জন্য প্রথম সুর করা গান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ ও প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ‘সন্ধিক্ষণ’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মধ্যে দিয়ে আলাউদ্দীন আলী চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। এরপর  তিনি ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘ফকির মজনু শাহ’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করলে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। আলাউদ্দীন আলী বাংলাদেশ চলচ্চিত্র, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন মিলে প্রায় পাঁচ হাজার গানের সুর সৃষ্টি করেছেন। এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, আছেন আমার মোক্তার আমার বারিস্টার, আমায় গেঁথে দাওনা মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা, শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে, কি করে বলিব আমি আমার মনে বড় জ্বালা, ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয় , চোখের নজর এমনি কইরা , যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, একবার যদি কেউ ভালবাসতো, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো,  সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি, একা একা কেন ভালো লাগে না, এই গানগুলি সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলীকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটির সুর করেছেন প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজ। গানটি তৈরীর সময়ে আলাউদ্দীন আলী আনোয়ার পারভেজের সহকারী ছিলেন। আলাউদ্দীন আলী’র সহকারী হলেন ফিডব্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফুয়াদ নাসের বাবু। আলাউদ্দীন আলীর সুর ও সঙ্গীতে গান করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, কুমার শানু, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, মিতালী মুখার্জীসহ প্রবীণ-নবীন অনেক শিল্পী। শুধু বাংলাদেশ নয় পাশের দেশ ভারতের অনেক বড় বড় শিল্পী পঙ্কজ উদাস, অভিজিৎ, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা ইয়াগনিকসহ আরো অনেকেই গান গেয়েছেন এই সুরস্রষ্টার সুরে। সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী মোট আট বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এর মধ্যে সাতবার শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে এবং একবার সেরা গীতিকার হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন।

আলাউদ্দীন আলী ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার সঙ্গীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে বিরল রেকর্ড করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় ‘সুন্দরী’, ১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ‘কসাই’। তিনটি সিনেমারই পরিচালক ছিলেন প্রয়াত আমজাদ হোসেন। এই তিন ছবিতে আলাউদ্দীন আলীর সাথে পুরস্কার লাভ করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী ও সাবিনা ইয়াসমিন, দুইটি ছবিতে গীতিকার হিসেবেও পুরস্কার পান আমজাদ হোসেন। এছাড়া আলাউদ্দীন আলী উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষের কালজয়ী ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমায় সঙ্গীতের কাজ করেন। আলাউদ্দীন আলী বাংলা গানে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কলকাতায়ও সম্মাননা পেয়েছেন। কলকাতার ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের যুব মন্ত্রণালয় আয়োজিত কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে আধুনিক বাংলা গানে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আলাউদ্দীন আলী, সলিল চৌধুরী, আশা ভোঁসলে, লতা মুঙ্গেশকর, ভুপেন হাজারিকা ও রুনা লায়লাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে একটি সেমিনারে আমার অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী ও এন্ড্রু কিশোর। তাঁদেরকে কথা বলতে না দিয়েই অনুষ্ঠান শেষ করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মহোদয়! এতে উপস্থিত সবার আপত্তি ছিল; যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন, এখানে উপস্থিত আছেন প্রখ্যাত সুরকার আলাউদ্দীন আলী ও কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রুকিশোর; আমরা তাঁদের কাছে রয়ালটি ও কপিরাইট বিষয়ে কিছু কথা শুনতে চাই। সবাই অনেক অনুরোধ করার পর তাঁরা দুইজন কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানে কথা বললেন এন্ড্রু কিশোর; তিনি গানের রয়্যালটি নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ”যদি গানের গীতিকার- সংগীত পরিচালক-সুরকার-কন্ঠশিল্পী গানের রয়্যালটি ঠিকমত পান, তবে তাঁদের কেউ একজন অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য অপরের দ্বারস্থ হওয়া লাগবে না। রয়্যালটি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই সে বহুবার ট্রিটমেন্ট করতে পারবে।” এ প্রসঙ্গে তিনি আমাদের দেশের বিভিন্ন ফোন কোম্পানি এবং এফ এম রেডিও’র কথা উল্লেখ করেছিলে। এছাড়াও মিউজিক ভিডিও আর টেলিভিশনে গানের অনুষ্ঠান থেকেও গানের রয়ালটি পাওয়া সম্ভব বলে তাঁরা মতামত ব্যক্ত করেন। আমরা কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রুকিশোরের কথার বাস্তবতাও পেলাম। কিন্তু গানের রয়্যালটি প্রাপ্তির বিষয়ে সমাধান হলো কিনা বোঝা গেলো না! সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী বাংলাদেশের গানের গীতিকার-সংগীত পরিচালক-সুরকার-কন্ঠশিল্পী’র রয়ালটি প্রাপ্তির বিষয়ে নিবেদিত হয়ে কাজ করেছেন। আলাউদ্দীন আলী অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও তাঁর গানের রয়ালটি দাবী করেছেন। তিনি কারো অনুগ্রহ নেবার চেয়ে নিজ রয়ালটি প্রাপ্তির দিকেই বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন এমন দিন আসবে তখন আর গানের রয়ালটি না দিয়ে আর কেউ পাড় পাবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন আজকের এই রয়ালটি আন্দোলন একদিন বিপ্লবে রূপ নেবে।

সঙ্গীত পরিবারের ছেলে স্টাইলিস্ট হিরো জাফর ইকবালকে সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী গায়ক হিসেবেও দর্শকদের মাঝে পরিচিত করেছেন। বদনাম ছবিতে নায়ক রাজ্জাকের লিপে `হয় যদি বদনাম হোক আরো’ জাফর ইকবালের অন্যতম একটি সেরা গান। এছাড়াও ‘ফকির মজনু শাহ’ সিনেমায় ‘প্রেমের আগুনে জ্বলে গেলাম ….’ এবং আধুনিক গান ‘সুখে থাকো নন্দিনী’ এই গানটিগুলোও দর্শকদের মাতিয়েছে। উল্লেখ্য, নায়ক জাফর ইকবাল গায়িকা শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের ছোট ভাই।

আলাউদ্দীন আলী ছিলেন সঙ্গীতের নেপথ্য নায়ক। তাঁর জীবনের প্রথম সুর করা গানটি ছিল দেশাত্মবোধক। আলাউদ্দীন আলী বাংলা ধ্রপদী ও লোকজ গান ব্যবহার করে আধুনিক গানের এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ছোঁয়ায় বাংলা সিনেমার গান ধন্য হয়েছে। তাঁর গান সব শ্রেণীর দর্শকের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। তবুও সুরকার আলাউদ্দীন আলী নিজ কণ্ঠে ‘ফকির মজনু শাহ’ সিনেমায় গাইলেন ‘কিবা যাদু জানো বন্ধু’ সেই সময় গানটি দর্শক নন্দিত হয়েছিল।

কেউ তাঁকে কোন দিন কথা দেয়নি। কেউ তাঁকে ভালবাসলে তাঁর নয়ন জলে ভাসতো। সময় হয়েছিল তবুও তিনি ফিরে যেতে চাননি। তবে তাঁকে যেতে হয়েছে চিঠি এসেছিল বলে! তাঁর পিঞ্জর ভেঙ্গেছিল, তবুও তিনি ডানা মেলেছিলেন। এরপরও তার মত কেউ সুখী ছিল? ভালোবাসা তাঁর কাছে জীবনের চেয়ে বড় ছিল তাইতো তিনি বদনামের ভয় করেননি, বিনি সুতার মালা গেঁথেছেন। সুরকার ও সংগীত পরিচালক সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী। এর বাইরে তিনি গীতিকার ও গায়ক হিসেবেও সমাদৃত। বাংলা সঙ্গীতের সুরের এই নেপথ্য যাদুকর ৯ আগস্ট ২০২০ সালে ৬৭ বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যধি ক্যান্সার ও বার্ধক্যজনিত কারণে ভক্তদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। তুমি সুরের মায়ায় বিনি সুতায় বেঁধেছ, গান দিয়ে করেছ ঋণী। ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধা সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী; তার মৃত্যু অনপনেয় ক্ষতি বাংলা সংগীতে।

লেখকঃ গল্পকার ও কবি

fattahtanvir@gmail.com

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে