ইরান সংকট: সংঘাতের আশঙ্কা ও বাংলাদেশের সতর্কতা

0
160

সাম্প্রতিক ড্রোন আক্রমণে ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানি নিহত হয়েছেন। আকস্মিক এ ঘটনার মাধ্যমে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের অবনতিই ঘটেনি, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। এর পরিণতিতে সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। জেনারেল সোলাইমানি শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা অথবা জেনারেলই ছিলেন না, তিনি ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর নেতা ছিলেন এবং ইরানের জনগণের কাছে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

জেনারেল সোলাইমানি বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাববলয় সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এ হত্যার যুক্তি দিতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে জেনারেল সোলাইমানি মার্কিনবিরোধী বড় ধরনের অপারেশনের পরিকল্পনা করছিলেন, যা বন্ধ করা তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অবশ্য এ দাবির কোনো বিশদ ব্যাখ্যা তারা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে কঠিন প্রতিক্রিয়া এসেছে। তাদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে এ আক্রমণের যথাযথ প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর প্রতি–উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইট করে বলেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড হলে তাদের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালানো হবে, যার ভেতরে ইরানের বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিশ্লেষণে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আবশ্যক প্রতিক্রিয়া থাকবে, যা ইতিমধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির ওপর ইরানের আক্রমণের মাধ্যমে।

বিগত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের অনুগত মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বাহিনী, সিরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স অন্তর্ভুক্ত। আমরা এ–ও জানি যে ইরান অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। কাজেই এসব বাহিনীকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে, তার ওপর আঘাত হানতে পারে। মার্কিন ভূখণ্ডে তাদের সম্মুখ আক্রমণ চালানোর সম্ভাবনা না থাকলেও, তারা সাইবার আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। অথবা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর সরাসরি আঘাত না হেনেও এ অঞ্চলে তাদের মিত্রদেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত অথবা ইসরায়েলের ওপর আঘাত হানতে পারে। যেহেতু ইরানের দৃষ্টি এখন পুরোপুরি সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে, এ অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা শূন্যতার কারণে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, যা সমগ্র বিশ্বের জন্য বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করতে পারে।

উল্লেখ্য যে ইরান এত দিন পর্যন্ত আইএসকে শক্ত হাতে দমন করেছে। ভূরাজনৈতিকভাবে ইরান একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। এবং এ অবস্থানের কারণে তারা হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আমরা জানি যে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল বহনকারী জাহাজ অতিক্রম করে এ প্রণালির ভেতর দিয়ে। ইরান যদি এ হরমুজ প্রণালিকে বন্ধ করে দেয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সংকটের মধ্যে পড়বে। এ ছাড়া এ সামগ্রিক অঞ্চলে যেকোনো ধরনের নৌযান চলাচল তারা বিঘ্নিত করতে পারে। ইরান অবশ্য বলেছে যে তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযান সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলের সব দেশ গভীর উৎকণ্ঠার ভেতর দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে এ কারণে যে পরবর্তী পদক্ষেপ এখন সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। ইরান এ–ও উল্লেখ করেছ যে সময় এবং স্থান তাদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয়ে রেখে নির্ধারণ করা হবে।

সোলাইমানি হত্যার প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই একটি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করছে। ২০১৮ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় পারমাণবিক চুক্তি থেকে এককভাবে বেরিয়ে আসে, তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পায়। সোলাইমানি হত্যার পরে ইরান ঘোষণা দেয় যে এ চুক্তির ভেতরে যা বাধ্যবাধকতা ছিল তা আর এখন তারা মানতে রাজি নয়। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছ যে এখন তারা ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করবে। এসব পদক্ষেপ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা অনেককে চিন্তিত করছে। রাজনৈতিকভাবে এ অঞ্চলে নতুন মেরুকরণ হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে, যেখানে ইরাকের ভেতরে ব্যাপক ইরানবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল এমনকি শিয়া–অধ্যুষিত নাজাফ শহরে ইরানের কনস্যুলেটও আন্দোলনকারীরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, সোলাইমানি হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এখন এ ঘটনাবলি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে বইতে শুরু করেছে।

ইরাকের সংসদ এক বিশেষ অধিবেশনে প্রস্তাব পাস করেছে যে ইরাকে অবস্থিত সব মার্কিন সেনা এবং বিদেশি সেনাসদস্যদের ইরাক ছেড়ে চলে যেতে হবে। ইরাক যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে সুদৃঢ় অবস্থান ছিল এবং যে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪ হাজার ৪৮০ জন সৈন্য প্রাণ দিয়েছে এবং প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে, সেই স্থান তারা হারাতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য হুমকি দিয়েছেন যে ইরাক যদি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, তাহলে ইরাকের ওপর চরম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

কার্যত, তাদের এ অঞ্চলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গেই সম্পর্কের বৈরিতা দেখা যাচ্ছে। এ অঞ্চলের বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয়ান মিত্ররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেনি। বরং দেখা যাচ্ছে যে ফ্রান্স ও জার্মানি মৃদুভাবে হলেও এর বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তারা সম্মিলিতভাবে ডাক দিয়েছে যে এ উত্তেজনা যেন প্রশমিত হয় এবং সব পক্ষ যাতে বিশেষ সংযম অবলম্বন করে। বিগত কয়েক মাসে ইরানের ভেতরে গণতন্ত্রের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার অগ্রভাগে ছিল সে দেশের তরুণসমাজ। এ ঘটনায় ইসলামিক বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো ইরানের ধর্মভিত্তিক নেতৃত্ব বিপুল চাপের মুখে পড়েছিল। সোলাইমানি হত্যার পর এখন সেই আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের জনগোষ্ঠী এখন সাধারণভাবে সরকারের পক্ষে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

মধ্যপ্রাচ্যের এ বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি যদি সংঘাতের দিকে চলে যায়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে। এর ফলে
বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। যেকোনো ধরনের সংঘাত হলে তঁাদের জীবন ও জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। এর কারণে, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিককে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা জরুরি হয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের বড় উদ্ধার কর্মসূচির জন্য পূর্বপরিকল্পনা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাপক হারে কমে গেলে রেমিট্যান্সনির্ভর আয়ে ধস নেমে আসবে। শুধু জাতীয় আয়ই নয়, এর ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। এর ফলে সম্ভাব্য যে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া হবে, তার বিশ্লেষণ এখনই আমাদের করতে হবে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার সম্পূর্ণভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তেলের ঊর্ধ্বমুখী দরের কারণে তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং এর ফলে দেশের আমদানি ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে, সংঘাত-বিমার খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আমাদের আমদানি ও রপ্তানি ব্যয়বহুল হবে। একইভাবে, বিমান চলাচল এবং বিমান কার্গোর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। এসব ব্যাপারে আমাদের আগাম পরিসংখ্যান এবং গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়াদির ওপর কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এখনো গড়ে তোলা যায়নি। ইরান সংঘাত থেকে আমাদের এ বিষয়ে শিক্ষা নিতে হবে এবং অবিলম্বে এ বিষয়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কূটনৈতিকভাবেও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, সংঘাত ও বিরোধের প্রধান দুটি দেশই বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ইসলামিক বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তির কারণে ইসলামিক উম্মাহর ভেতরে নতুন টানাপোড়েনের সৃষ্টি হবে, যা আমাদের বিচক্ষণতার সঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে। সর্বোপরি আগামী দিনগুলো আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে করে আমরা হঠাৎ করে একটি প্রস্তুতিবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হই।

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে