ঐতিহ্যবাহী কুমড়া বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত চাটমোহরের দোলং গ্রাম

0
91

চাটমোহর প্রতিনিধিঃ   শীতের খাবারে ভিন্ন স্বাদ আনতে সবজিতে কুমড়া বড়ির প্রচলন দীর্ঘদিনের। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী শীতের পিঠাপুলি খাবারের মত কুমড়া বড়িরও বেশ কদর রয়েছে। আর এই মুখরোচক সুস্বাদু খাদ্য অতিযত্নসহকারে শৈল্পিকভাবে তৈরি করে আসছে পাবনার চাটমোহরে দোলং গ্রামের কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগরেরা।

চাটমোহর পৌর এলাকার পাশেই দোলং গ্রামের প্রায় ২০টি পরিবার দীর্ঘ ৫০ বছরে ধরে এই কুমড়া বড়ি তৈরির কাজ করে আসছেন। শীতের শুরু থেকে চার মাস এই কুমড়া বড়ি তৈরির কাজে বেশ ব্যস্ত সময় পার করেন তারা।

তবে বাজারে ডালের দাম বৃদ্ধি ও করোনার কারণে এখন বিক্রি কম। তবু বসে নেই এই কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগরেরা। এই কুমড়া বড়ি স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলাতে।

শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাজারে নানা ধরনের সবজির সমাহার দেখা যায়। গ্রাম অঞ্চলগুলোতে খালবিল নদীনালার পানি এই সময়ে কমতে শুরু করে। এই সময়ে মাছের সাথে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের সবজিও বাজারে ওঠে। আর এই সবজি আর মাছ রান্নাতে ব্যবহার হয় কুমড়া বড়ি।

সময় আর কাজের ব্যস্ততার কারণে অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও সুস্বাদু এই কুমড়া বড়ি তৈরি করতে পারে না। তবে সেই চাহিদার অনেকাংশে পূরণ করছে পাবনা চাটমোহর দোলং গ্রামের কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগরেরা। বাজারে চাহিদা আর স্বাদের ভিন্নতার জন্য চার প্রকারের ডাউল মসলা আর চালকুমড়া দিয়ে তৈরি হয় এই খাদ্যসামগ্রী। বাজারে প্রচলিত এ্যাংকার, মটর, ছোলা ও মাশকালাইয়ের ডাল ব্যবহার করা হয় এই কুমরা বড়ি তৈরিতে।

পরিবারের কাজের ফাঁকে কুমড়া বড়ি তৈরি করে বাড়তি উপর্জনের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই গ্রামের নারী ও পুরুষরা। দোলং গ্রামের এই কুমড়া বড়ি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে এই বছরে করোনা আর ডাউলের দাম বৃদ্ধির কারণে খুব একটা লাভ হচ্ছে না তাদের। তবু ঐতিহ্য আর বাড়তি লাভের আশায় বর্ষার শেষে অক্টোবর মাস থেকে শুরু করে ও শীতের শেষে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চলে এই কুমড়া বড়ি তৈরির কাজ।

ডাল ভেদে দাম নির্ধারণ হয় এই কুমড়া বড়ির। ৭০ টাকা কেজি থেকে শুরু করে ১২০ টাকা কেজি পাইকারদের কাছে বিক্রি করলেও খুচরা বাজারে দুইশো থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে এই কুমড়াবড়ি। ভোর থেকে মাল তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে সূর্য উঠা পর্যন্ত চলে এই কাজ। শীতের প্রখর রৌদ্রে দুইদিন শুকিয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত হয় এই খাদ্যপণ্যটি।

আগে পাটায় ডাল পিষতে সময় আর কষ্ট হতো অনেক। আর বর্তমানে মেশিনের মাধ্যমে ডাল পিষে অতি সহজে এই কাজটি করছেন তারা। ডালের সাথে  কুমড়া, কালোজিরা আর বিভিন্ন প্রকারের মসলা মিশিয়ে শৈল্পিক হাতে তৈরি হচ্ছে এই কুমড়াবড়ি। প্রতদিন দুইশো থেকে তিনশো কেজি বিভিন্ন প্রকারের ডাল ব্যবহার হচ্ছে কুমড়া বড়ি তৈরির কাজে।

এলাকার স্বেচ্ছাসেবক ব্যবসায়ী রনী রায় বলেন, টাচমোহরের দোলং গ্রামের কুমড়া বড়ি এই অঞ্চলের বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। আমাদের এলাকায় প্রচুর পরিমাণে মাছ ও সবজি পাওয়া যায়। গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষ এই সময়ে মেয়ে জামাই দাওয়াত করে। পিঠাপুলির সাথে তরকারিতে থাকে কুমড়া বড়ি। অন্যরকম একটি স্বাদ অনুভব করা যায়।

কুমড়া বড়ির কারিগর ও ব্যবসায়ী মানিক কুমার ভৌমিক বলেন, এই বছর মালের দাম বৃদ্ধি হওয়ার কারণে লাভের পরিমাণ কমে গেছে। তবু বসে না থেকে প্রতি বছরের মত এবারো কুমড়া বড়ি তৈরির কাজ করছি। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের নারীরা এই কাজ করে থাকেন। আমরা শুধু মালের যোগান দিই।

কুমড়া বড়ি তৈরির নারী কারিগর শেফালী রানী বসাক বলেন, দুই টাকা কেজি থেকে শুরু করে আজ ১২ টাকা কেজিতে কাজ করছি। পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা আমার কাজের। শীতের এই চারমাস আমাদের ঘরে বসে কাজ করে একটু বাড়তি আয় হয়। প্রতিদিন ৪ থেকে ৬শ টাকা আয় হয়। মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আমরা পাই। সেটি দিয়ে পরিবার ও নিজের চাহিদা মিটিয়ে থাকি।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) পাবনা অঞ্চলের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের একটি অংশ এই কুমড়া বড়ি। এই শৈল্পিক কাজের সাথে বেশির ভাগ নারী শ্রমিক কাজ করে থাকেন। বিসিক নারী উদ্যোক্তা বা শ্রমিকদের জন্য সবসময় সহায়তা করে।

এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগরদের একটি তালিকা করে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণসহ সল্প সুদে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থার কথা জানালেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমরা সবসময় পাশে আছি। বিশেষ করে নারী ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা যদি আমাদের কাছে আবেদন করে তবে অবশ্যই তাকে সহযোগিতা করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে