কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য হুক্কা

0
176

রাজিবুল হকঃ আধুনিকতার দাপট আর যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার অনেক ঐতিহ্য। তার মধ্যে অন্যতম একটি হল গ্রাম বাংলার হুক্কা । চলনবিল এলাকায় যেটি ‘হুকা’ নামে পরিচিত।  এক সময় গ্রাম-গঞ্জে হাজার  মানুষের জনপ্রিয় ধুমপানের মাধ্যম ছিল হুক্কা। কুলি-মজুর থেকে শুরু করে রাজা-বাদশারাও আসক্ত ছিলেন হুক্কার এই নেশায়। কিন্তু তা আজ আর কই? তেমনি কালের আবর্তেই হারিয়ে যাচ্ছে চলনবিল তথা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ ‘হুক্কা’। ধূমপানের জনপ্রিয় এই মাধ্যম গ্রামবাংলার বিনোদন, আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতির প্রতীক। সে সময় ধনী-গরিব প্রতিটি বাড়িতেই ছিল হুক্কার প্রচলন। আজ থেকে এক দুই দশক আগেও গ্রামগঞ্জে ধূমপায়ীরা হুক্কার মাধ্যমে নেশায় অভ্যস্ত ছিল। পুরুষের পাশাপাশি বয়স্ক নারী এবং ছেলেমেয়েরাও হুক্কার মাধ্যমে ধূমপান করত। অনেকে শখের বশেও হুক্কায় দিত আয়েশি টান। এ ছাড়া নাটক, সিনেমায় অভিনয়ে ধনীদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পিতলের তৈরি ‘হুক্কা’ ও গরিবদের জন্য নারিকেলের খোল দ্বারা তৈরি ‘ডাবা’ ব্যবহার করা হতো। যা মানুষের জীবনের উঁচু-নিচু পার্থক্য নির্ণয় করত। এক সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক হিসেবে ‘হুক্কা’ খুবই জনপ্রিয় ছিল। এখন সবই অতীত।

চলনবিল এলাকার কয়েক প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেকালে গ্রামের বিভিন্ন বৈঠকখানায় মেহমানদের জন্য প্রধান আকর্ষণ ছিল হুক্কা। হুকা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা দক্ষিণপাড়ার খলিল প্রামানিক বলেন, একসময়  গ্রামের কামলা, দিনমজুর ও বয়স্করা হুক্কার নেশায় মাতোয়ারা ছিল। তখন বিড়ি সিগারেটের প্রচলন খুব একটা ছিল না।  তামাক পাতাগুলোকে টুকরো টুকরো করে কেটে এতে চিটাগুড় মিশ্রিত করে তৈরি হত হুক্কার প্রধান উপাদান ‘তামুক’। তামুক মাটির তৈরি কলকি’র মধ্যে দিয়ে কয়লার ‘টিক্কা’র মাধ্যমে আগুন দিয়ে ধূমপান করা হতো। অনেক সময় নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ছোট গুটির মত পাকিয়ে কলকির মধ্যে দিয়ে আগুন ধরানো হতো। সেই গুটি কয়লার মত জ্বলত। মাটির তৈরি কল্কির ওপর তামুক রেখে টিক্কায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে হুক্কার নীচের ছিদ্রে মুখ দিয়ে টান দিলে  নিঃসরিত ধোঁয়া হুক্কার তলানির পানিতে এসে কুড়ুত কুড়ুত শব্দ বের হয়ে আসতো। তা থেকে একপ্রকার সুগন্ধি বের হতো। হুক্কার শব্দে দুর থেকে বুঝা যেত আশেপাশে কেউ হুক্কা টানছে।

হুকা নিয়ে চলনবিলের কচুগাড়ী গ্রামের প্রবীণ  ডাঃ লুতফর রহমান বলেন, আগের যুগে গ্রামের গার্হস্থদের বাড়ীর বৈঠক খানা বা বাহির বাড়ীতে লোকজন বসে হুকা খেত। তখন লোকজনের সামর্থ ছিলনা বিড়ি কিনে খাওয়ার। অবসর সময়ে বা কাজের ফাঁকে  সবাই একত্রিত হয়ে আরামে হুকা টানত। আধুনিকতার  ছোঁয়া লেগে এখন হুকা খাওয়া নেই বললেই চলে।

গ্রামের হুক্কায় ধূমপানের জন্য এক সময় হাটবাজারে তামাক ও তামাকের গুড়া  বিক্রি করতে দেখা যেত। বিক্রি করা হতো নারিকেলের খোল দ্বারা হাতে তৈরি হুক্কা। যা ‘ডাবা’ নামে পরিচিত ছিল। হুক্কা নিয়ে গ্রামবাংলায় একটি জনপ্রিয় লোকগান প্রচলিত ছিল। ‘প্রাণের হুক্কারে/ তোর নাম কে রাখিলো ডাবা/ হুক্কা আমার নাতিপুতি/ হুক্কা আমার বাবা’। কালের পরিক্রমায়  গ্রামে গ্রামে হুক্কায় তামাকপানের যে প্রচলন ছিল তা আর দেখা যায় না।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হুক্কায় ধূমপান করা দূরে থাক চোখেই দেখেনি হুক্কা। হুক্কার জায়গা দখল করে নিয়েছে বিড়ি, সিগারেট, গাঁজাসহ অন্যন্য মাদকদ্রব্য। যার মধ্যে রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর নিকোটিন। তার পরেও এই মরণ নেশায় জড়িয়ে পড়েছে যুব সমাজ। যাদের নিয়ে দেশের সব অভিভাবক মহল থাকেন সব সময় উদ্বিগ্ন। এক কালের গ্রাম বাংলার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান ‘হুক্কা’ আজ বিলুপ্তির পথে। ঘরের বারান্দায় বা দেউড়ি নয়,  হুক্কার স্থান এখন মিউজিয়ামের শেলফে। এ ছাড়া অনেকে শখ করে মেলা থেকে হুকা কিনে এনে বাসার ড্রয়িং রুমে সাজিয়ে রাখে। স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখন এভাবেই শোভা পাচ্ছে গ্রাম বাংলার এই চিরায়ত ঐতিহ্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে