গল্প ও নাটকে হুমায়ূন আহমেদ সেরা : মৌলি আজাদ

0
158

মৌলি আজাদের জন্ম ১৯৭৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে থেকে তিনি এলএলবি এবং এলএলএম সম্পন্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি আইন বিষয়ে লেখালেখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭টি। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি আমাদের প্রশ্নের জবাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন।

প্রশ্ন : আপনি হুমায়ূন আহমেদের লেখা কেমন পড়েছেন?

উত্তর : আমি ওনার লেখার খুবই ভক্ত ছিলাম।

প্রশ্ন : কোন সময় পড়তে শুরু করেন?

উত্তর : স্কুল থেকেই পড়ি।

প্রশ্ন : এখনও পড়েন?

উত্তর : নতুন বই পেলে পড়ি। পড়তে ভালো লাগে, তবে ওনার গল্প মনে থাকে না। বুঝেছেন?

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদ পড়েন বলে আপনার বাবা হুমায়ুন আজাদ আপনাকে ব্যঙ্গ করতেন না?

উত্তর : আমার পড়ার স্বাধীনতা ছিল। আব্বা ইন্ডিয়ান রাইটারদের লেখা পড়া খুব একটা পছন্দ করতেন না। এখন যেমন লেখকরা ইন্ডিয়ান লেখকদের বিষয়ে গদগদ করেন, আব্বা তা পছন্দ করতেন না।

প্রশ্ন : ‘অপন্যাস’ শব্দটি তো হুমায়ূন আহমেদকে মনে রেখেই বলেছিলেন, মেবি?

উত্তর : হু, তা ঠিক।

প্রশ্ন : ইন্ডিয়ান লেখক মানে নিশ্চয়ই সুনীল-সমরেশ? কবিতা তো তিনি পছন্দ করতেন।

উত্তর : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা তিনি পছন্দ করতেন।

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদ আপনার কেন এত প্রিয়, ব্যাখ্যা করতে পারবেন?

উত্তর : হুম পারবো। ক. ভাষা খুব সহজ। খ. তার গল্প মানে আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের কাহিনি। গ. বাক্য ছোট। ঘ. হালকা রসিকতা। ঙ. কিছু চোখ ভেজানো প্রসঙ্গ। চ. পড়তে ক্লান্তি আসে না। ছ. এমন চমক রাখতেন যাতে শেষ না করে উঠতে পারতাম না। জ. তার গল্পে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কথা থাকত যা জানার জন্যও পড়তাম।

প্রশ্ন : আচ্ছা। তাকে আমাদের দেশের ‘সিরিয়াস রাইটার’রা কেন নিলেন না? আপনার মত কী?

উত্তর : আমার মতে, তার কারণ হল ঈর্ষা।

প্রশ্ন : আবার দেখুন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক বা হাসান আজিজুল হককে যেমন লেখক হিসেবে ভাবা হয় হুমায়ূন আহমেদকে কিন্তু তা মনে করা হয় না। আপনার কী মনে হয়, তা-ও কি ঈর্ষা?

উত্তর : হুমায়ূন আহমেদ আমজনতার কাছে পরিচিত, যাদের নাম বললে তারা কিন্তু নন। আমি সমাজের টপ লেভেলের অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি তারা লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ ও হুমায়ুন আজাদকে কেবল চেনেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখার চাইতে তারা তার নাটকের জন্য বেশি চেনেন। আর আমার বাবা প্রসঙ্গে যখন তাদের জিজ্ঞেস করেছি, তারা বলেছেন বাবার ওপর আক্রমণ হবার পর তার প্রতি তারা বেশি ফোকাসড হয়েছেন।

প্রশ্ন : উপন্যাস বলতে আমাদের মনে যে ইমজ তৈরি হয়—যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা তারও আগে তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি—হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কি সেই ইমেজ তৈরি করতে পেরেছে?

উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাথে হুমায়ূন আহমেদের তুলনা চলে না। হুমায়ূন আহমেদের সেরা কাজ তার গল্প ও নাটকে, সিনেমায়ও কিছু নতুনত্ব এনেছেন।

প্রশ্ন : আমি যেটা বলতে চাই, হুমায়ূন আহমেদ তুমুল জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও সাহিত্যিক মহলে বা একাডেমিকভাবে আন্ডাররেটেড রয়ে গেলেন, এর কারণ কী?

উত্তর : ঈর্ষা। ঢাবির কেমিস্ট্রি বিভাগের এক অধ্যাপককে বলেছিলাম, হুমায়ূন আহমেদ আপনাদের ডিপার্টমেন্টের জুয়েল, কিন্তু কখনো শুনিনি তাকে নিয়ে কোনো আয়োজন করতে। উনি আমার কথা শুনে বিরক্ত হয়েছিলেন। যত যাই বলি, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বইয়ের দিকে ফেরাতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদের কোনো চরিত্র আপনার মাথায় ঘোরে?

উত্তর : হ্যাঁ, জলিল সাহেব। যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য অনেকের সিগনেচার সংগ্রহ করতো।

প্রশ্ন : গল্পটার নাম মনে আছে?

উত্তর : জলিল সাহেবের পিটিশন।

প্রশ্ন : গল্পটা কেমন ছিল?

উত্তর : ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পটা যতদূর মনে পড়ে জলিল সাহেবের দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। তারপর থেকে জলিল সাহেব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যাকে পান তার কাছ থেকে সিগনেচার সংগ্রহ করতেন। আমার মনে আছে গল্পে একজন বলেছিলেন, এসব সিগনেচার সংগ্রহ না করে বরং দুই ছেলের মৃত্যুর কথা বলে সরকারের কাছে দরখাস্ত করে একটা বাড়ি নিয়ে নিন বরং। জলিল সাহেব এই কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে এক কথায় কী বলবেন?

উত্তর : হুমায়ূন আহমেদকে আমার গল্পের জাদুকর মনে হয়। তিনি আমাদের বইয়ের দিকে টেনে নিতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজার এত দীন দ‌রিদ্র কেন?

উত্তর : এত বড় বইমেলা হয়, এত এত বই বের হয়, বইয়ের বাজার ছোট হল কোথায়? বইমেলা শেষে বিরাট অঙ্কের বই বিক্রির সংবাদ শুনি। অনেকে বলেন তাদের বই নাকি প্রি-অর্ডার হয়, অনেকে বলেন বই স্টলে আসতে না-আসতে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বইয়ের বাজার ছোট না বলে বলুন, কেন এখনো লেখকেরা যথাযথ সম্মানী পান না।

প্রশ্ন : বলা হয় হুমায়ূন আহমেদ পাঠক সৃ‌ষ্টি করেছেন—তো সেই পাঠক কোথায় এখন?

উত্তর : কে বলে, জানি না তো! টপ টু বটম জিজ্ঞেস করুন সব জায়গায় তার পাঠক আছে। অবশ্য ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার সময় হয়তো তা বলে না। স্ট্যাটাস দেবার সময় আমরা কাফকা, বোর্হেস এসব পড়ছি বলে নিজেদের খুব উচ্চমার্গের পাঠক হিসেবে তুলে ধরতে চাই।

প্রশ্ন : বইয়ের দোকানগুলো তো টিকে আছে ভারতীয় বই বি‌ক্রি করে। অনেকে দোকান বন্ধও করে দিচ্ছেন। এই বিপরীত চিত্র কেন?

উত্তর : ভারতীয় বই-ই বা কয়টা বিক্রি হচ্ছে? কথা হল, আমাদের পড়ার অভ্যাস অনেক কম। আমি দেখেছি, ৫,০০০-১০,০০০-২০,০০০ টাকার জিনিস কিনেও মানুষ ভাবছে তারা বেশি টাকার জিনিস কেনেননি, কিন্তু কোনো বইয়ের দাম যদি শোনেন ৫০০ টাকা, ব্যাস মাথা গরম হয়ে যায়। বই ফ্রি চাওয়া তো রীতিমতো আমাদের অভ্যাস। এক লেখক আরেক লেখকের বই কিনছেন এটাও তো খুব একটা দেখা যায় না।

প্রশ্ন : হুমায়ূন আহমেদের বই কেনায় কৃপণতা তো ছিল না। তার মৃত‌্যুর পর তার পাঠক কি বেড়েছে?

উত্তর : স্টলের ভিড় তো কমেনি! আমার মনে হয়, কে কার চেয়ে ভালো লিখছে তা দাড়িপাল্লায় মেপে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। পাঠকই ঠিক করে কার বই তারা গ্রহণ করবে কারটা করবে না। এখানে আবার প্রশ্ন আসে পাঠক কারা? তবে পাঠককে বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা এখন ঘরে বসেই সব জানতে পারে।

ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেবার জন্য।

আপনাকেও।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে