গোল্ডেন মনিরসহ ৫ সহযোগীর উত্থান : স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার ; স্বর্ণের বড় চালানে অর্থলগ্নি করেন তারা

0
144

স্বর্ণ চোরাচালান এবং হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত গোল্ডেন মনিরের চার সহযোগীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। মনিরের মতোই তার চার সহযোগীর অবিশ্বাস্য উত্থান হয়েছে। এক সময় আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকলেও এখন তারা দেশে-বিদেশে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তারা বড় বড় স্বর্ণ চোরাচালানে অর্থলগ্নি করেন। অন্য চারজনও গোল্ডেন মনিরের মতোই স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার।

মনিরের মতো তাদের জীবনও রহস্যঘেরা। চার সহযোগীর মধ্যে দু’জনই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বাকি দু’জন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রাজনীতি ও ব্যবসার আড়ালে ৫ জনই স্বর্ণ চোরাচালানের অর্থলগ্নি এবং হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করেন। আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে তারা ভারতেও স্বর্ণ পাচার করেন। এ ছাড়া দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া থেকে কম দামে স্বর্ণ কিনে বাংলাদেশে নিয়ে আসে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ  বলেন, গোল্ডেন মনিরের বিষয়ে যেসব সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে তারা এরইমধ্যে একজন করে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। তারাই সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা  বলেন, দেশের বড় বড় চোরাচালানের সঙ্গে গোল্ডেন মনির এবং তার সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মনিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি ব্যাংকের কর্মচারী ছিলেন। ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন। তিনি এখন একটি উপজেলার চেয়ারম্যানও।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোল্ডেন মনিরের অন্যতম সহযোগী। তিনি নব্বইয়ের দশকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে ভাসমান হকার ছিলেন। ১৯৯৬ সালে দু’জন কাস্টমস কর্মকর্তার সহযোগিতায় লাগেজ টানা শুরু করেন। স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে তারা এখন দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদের মালিক।

মনিরের ঘনিষ্ঠ অপর একজন বর্তমানে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি সত্তরের দশকে ছিলেন ভ্রাম্যমাণ ডলার বিক্রেতা। এখন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মালয়েশিয়ায় তার বাড়ি আছে। অপর সঙ্গীও সত্তরের দশকে ১২ বছর বয়সে ঢাকায় আসেন। তখন ভ্রাম্যমাণ হকার হিসেবে শার্ট-প্যান্ট বিক্রি করতেন। পঞ্চম শ্রেণি পাস সঙ্গীটি স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হন।

জানা গেছে, গত সপ্তাহে গোল্ডেন মনির গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই এলাকায় দেখা যাচ্ছে না তার সহযোগীদের। উত্তরার জমজম টাওয়ারে তার কার্যালয়েও তারা যাচ্ছেন না।  তাদের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে উপজেলা চেয়ারম্যানের দুটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বন্ধ পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ বিমানের একটি এয়ারক্রাফট থেকে ১২৪ কেজি চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। ২০১৪ সালে পল্টনে মোহাম্মদ আলীর বাসার বিছানার নিচ থেকে ৬১ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের পাশাপাশি তাকে গ্রেফতার করে ডিবি। একই মামলায় রিয়াজ উদ্দিনও গ্রেফতার হন। পরে মোহাম্মদ আলী এবং রিয়াজ উদ্দিন দু’জনেই জামিনে ছাড়া পান।

তবে সালেহ আহমেদকে গ্রেফতার করা যায়নি। ওই দুটি ঘটনার তদন্ত করে ডিবি। মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে দুটি চালানেই রিয়াজ উদ্দিন, সালেহ আহমেদ এবং মোহাম্মদ আলী অর্থলগ্নি করেছেন। এ ঘটনায় একজন ভারতীয় এবং একজন নেপালি নাগরিক জড়িত ছিল বলেও তদন্তে বেরিয়ে আসে।

বড় বড় স্বর্ণ চোরাচালানে দেশি-বিদেশি যৌথ সিন্ডিকেট জড়িত থাকে। এমনকি বাংলাদেশ বিমানের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাধ্যমে বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারগেট দিয়ে স্বর্ণ খালাস করা হয়। পরে তাঁতীবাজারে স্বর্ণের বার গলিয়ে বিক্রি করা হয়। চোরাচালানের একটি অংশ আবার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোল্ডেন মনির ও তার সহযোগীরা মিলে উত্তরার জমজম টাওয়ার নির্মাণ করেন। ওই টাওয়ারের চারজন মালিকই স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার।

উল্লেখ্য, গত ২১ নভেম্বর রাজধানীর মেরুল বাড্ডার বাসা থেকে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ২২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা হয়। বর্তমানে তিনি রিমান্ডে আছেন। তাকে গ্রেফতারের পর সরকারের একাধিক সংস্থা তার অপকর্মের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে