চলনবিলের উন্নয়ন যেন পরিবেশ সম্মত হয় সেদিকে নজর দিতে হবে – ডঃ নজরুল ইসলাম

0
24
আবুল কালাম আজাদ:
চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ বিষয়ক  মতবিনিময় সভায় জাতিসংঘ গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহ সভাপতি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক ( বেন) এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ নজরুল ইসলাম বলেছেন- আমরা পরিবর্তন চাই, এই পরিবর্তন যেন পরিবেশ সম্মত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদী হয়। তাই চলনবিলের উন্নয়ন পরিবেশ সম্মত এবং দীর্ঘ মেয়াদী হয় সেদিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। কিন্তু চলনবিলে তা হচ্ছেনা। চলনবিলের উন্নয়নের নামে বেপরোয়া দখল-দূষণ কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছেনা। নদী কমিশনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও চলনবিলের মানুষের প্রাণের দাবী বড়ালের উৎস মুখে স্লুইস গেট অপসারণের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। এত আন্দোলনের ফসল আদালতের রায়ও আমলাতান্ত্রিক অসহযোগিতায় কার্যকর হচ্ছেনা। হাইকোর্ট ২০১৯ সালে  নদীর জীবনীসত্ত্বার যুগান্তকারি রায় দিয়েছেন। নদির এই জীবনীসত্ত্বার মালিক নদী কমিশন। নদী আমার মা, আমরা মা’কে হত্যা করছি। এই মা’কে রক্ষা করতে বৈশ্বিক, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন ইস্যুভিত্তিক চালিয়ে যেতে হবে। আন্দোলনে সাফল্য আসতে সময় লাগে। স্থানীয় পর্যায়ের অনেক আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।স্থানীয় মানুষের সুনির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন স্থানীয় ভাবেই করতে হবে। গত সোমবার  গুরুদাসপুরের কাছিকাটায় আরডিও পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউটে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের আয়োজনে ” চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ ” বিষয়ক দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের আয়োজনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচক চলনবিল রক্ষা আন্দোলন এর সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান চলনবিলের প্রধান প্রধান সমস্যা তুলে ধরে বলেন- ডেল্টা প্ল্যান জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা হোক। চলনবিলে পর্যটন কেন্দ্রের নামে কী করা হবে তা জনগনকে জানাতে হবে। চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের ৩ বছরের কর্মসূচি বাস্তবায়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চলনবিল ব্যাপী ঐতিহাসিক মানব বন্ধন করতে চাই। চলনবিল রক্ষার স্বপক্ষে চলনবিলের ৫ লক্ষ মানুষের গণ স্বাক্ষর সংগ্রহ করবো। আন্দোলন ধারবাহিকভাবে চালাতে হবে, এর কোন বিকল্প নাই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ( বাপা)র জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন-চলনবিলের জীবন রক্ষায় বড়ালের অবদান আছে। বড়ালে পলি জমবেনা, বড়ালে পানি গড়াবে ,চারঘাটের স্লুইস গেট অপসারণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্দোলন কার্যকর করতে হলে শক্তি অর্জন করতে হবে। আন্দোলন করতে ইউনিটি করা দরকার। আন্দোলনকে অবশ্যই সাংগঠিক ভাবে আগাতে হবে। স্থানীয় ভাবে আন্দোলনের শক্তি অর্জনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের জ্ঞানভিত্তিক মোটিভেশন করতে হবে। জনগনের কাছে যেতে হবে। জনগনের কাছে যেতে হলে জনগনের ইস্যু চিহ্নিত করতে হবে।
 মতবিনিময় সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ( পাউবো)র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী  ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বিশেষজ্ঞ  প্রকৌশলী  সাজিদুর রহমান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন-চলনবিলের তথ্যপ্রবাহ তৈরি করতে হবে। চলনবিলের স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চলনবিলের খাল,বিল, নদী -জলাশয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের ডাটাবেজ তৈরী করা হলে আন্দোলনের ইস্যু গ্রহণে সহজ হবে। আন্দোলন বেগবান হলে নদী কমিশনও কাজ করবে। নদী দখলদার, দুষণদারদের নাম ঠিকানাসহ ডাটা তৈরী করলে বাস্তবায়ন সহজ হবে। জাতীয় নদী কমিশনে দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে হবে এবং জেলা পর্যায়ে বিভাজন করতে হবে।
চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ বিষয়ক অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এস এম মজিবুর রহমান মজনুর সঞ্চালনায় মুক্ত আলোচনায় চারঘাট উপজেলার সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, বড়ালের উৎস মুখ ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়াতে হবে। বড়ালের উৎস মুখ থেকে পদ্মার পানি ৩/৪ মিটার নীচে থাকায় বড়ালে পানি ঢুকতে সময় লাগে। চারঘাটের স্লুইস গেট অপসারণ করে প্রশস্ত ব্রীজ নির্মাণ করা হোক।
চারঘাটের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মতিউর রহমান তপন বলেন, ১৯৮০ সালে বড়ালের উৎস মুখে চারঘাটে স্লুইস গেট নির্মাণের  ঘোষণা  আসলে আমরা স্লুইস গেট নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, আন্দোলন করেছি। স্লুইস গেট না করে ব্রিজের দাবী করেছিলাম। সেই সময়েই বড়ালকে ধংস করা হয়েছ। আজ প্রমত্তা বড়ালের তলদেশে পানি নাই। চলছে যানবাহন, ধান চাষ, ফুটবল- ক্রিকেট খেলা। কোন গণ শুনানী কখনো আলোর মুখ দেখে নাই। গণ শুনানী  নয়, আন্দোলন দিয়ে প্রতিহত করতে হবে।  আন্দোলনের কর্মসুচি নিতে হবে।
বাঘা উপজেলার ফরজ আলী বলেন, শুধু স্লুইস গেট ভাঙ্গলেই বড়ালে পানি আসবেনা। ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরে আনতে হবে। এতে বড়াল বাঁচবে, নারদ- মুসা খাঁ বাঁচবে। এ জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে হবে।
বাগাতিপাড়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হাদি বলেন, চলনবিলে চলছে ব্যাক্তি মালিকানায় বাণিজ্যিকভাবে পুকুর খননের মহাযজ্ঞ। চারঘাটের স্লুইস গেটের কারণে চলনবিলকে ধংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নদী বাঁচলে চলনবিল বাঁচবে। নদী ও চলনবিল বাঁচাতে হলে গ্ণ আন্দোলন করতে হবে।
পুঠিয়া উপজেলার  আব্দুল করিম বলেন, পুঠিয়া, বাঘা ও বাগাতিপাড়া তিন উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত নারদ ও মুসাখাঁ  নদী । মুসাখাঁ নদীতে ৫০ টি ওয়াল তৈরী করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ওয়ালগুলি অপসারণ করতে হবে।প্রধান কাজ চারঘাটের স্লুইস গেট অপসারণ করে বড়াল, নারদ, মুসাখাঁ নদী  ও চলনবিলকে বাঁচাতে হবে।
বড়াইগ্রামের অধ্যাপক আমিনুল হক  মতিন বলেন,নদী  যেখনে আছে সেখানে দখল- দুষণ চলছে ।বর্জ্য ফেলে নদী দুষণ ও ভরাট চলছে। বড়াল ভরাট করে পাকা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। দখল- দুষণ বন্ধ করতে হবে। অপসারণ করতে হবে। আন্দোলন বেগবান করতে হবে।
চাটমোহরের সাংবাদিক বেলাল হোসেন স্বপন বলেন, চলনবিল থাকবে চলমান। সেই চলনবিলের চলন বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন জ়েলা-উপজেলা থেকে যারা এসেছেন সবাই চলনবিল রক্ষা করতে একাত্ম।
চাট্মোহরের সাংবাদিক হেলালুর রহমান জুয়েল বলেন,চলনবিলের প্রাণ বড়াল বাঁচলে চলনবিল বাঁচবে। সেই বড়াল রক্ষায় চলনবিলের মরন ফাঁদ চারঘাটের স্লুইস গেট অপসারণের দাবীতে ২০০৮ সাল থেকে আমরা আন্দোলন করে আসছি । প্রমত্তা বড়াল মারা গেছে। বড়াল এখন ভাগারে পরি্তণ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সাথে সমন্বয় করা দরকার। আমরা আন্দোলনে জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। চলনবিলকে বাঁচাতে হলে জনগনকে সাথে নিয়ে গণ আন্দোলন চাঙ্গা করতে হবে।
ফরিদপুর উপজেলার মীর আব্দুল হাই বলেন, চলনবিলকে চলনশক্তি ফিরিয়ে নিতে নদীগুলিকে সচল করতে হবে। নদীগুলিই চলনবিলের মূল চালিকা শক্তি। নদী গুলিকে নদীতে ফিরিয়ে দেওয়া গেলেই চলনবিলের চলন চলমান হবে।
নাটোরের সাথি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শিবলী সাদিক বলেন,নাটোরের নারদের উৎস মুখে সুগারমিল, যমুনা ডিষ্টিলারিজ , প্রাণ কোম্পানি এবং নাটোর পৌরসভার বর্জ্য পড়ে দুষণ করছে।। পরিবেশ ধ্বংস করছে। মুসাখাঁ- নারদের বাঁধ অপসারণ করতে হবে। চারঘাটের স্লুইস গেট অপসারণ করে প্রশস্ত ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে।
সিংড়া উপজেলার পরিবেশবাদী অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, জীববৈচিত্র রক্ষা না হলে পরিবেশ আন্দোলনে সফলতা আসবেনা। আমাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চলনবিলের নদীর সূতিজালসহ অবকাঠামো উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছে। চলনবিলের পরিবেশ ধ্বংস করে পর্যটন কেন্দ্রের নামে মিনি কক্সবাজার না করে চলনবিলকে চলমান রাখতে হবে। মাছের  অভয়াশ্রম না থাকায় চলনবিলের দেশীয় জাতের মাছ ও জলজ সম্পদ বেশী হুমকির মুখে।
গুরুদাসপুর উপজেলার সাংবাদিক এমদাদুল হক বলেন, চলনবিল এবং নদী রক্ষা আন্দোলন করতে হলে চলনবিলের প্রতিটি জেলা, উপজেলা , ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠন করতে হবে। বড়ালের উৎস মুখ চারঘাট উপজেলায় কমিটি জোরদার করতে হবে। আন্দোলন করতে হলে অফিস থাকা দরকার। সেই অফিস থেকে আলোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনা করে আন্দোলনের কর্মসুচি গ্রহণ করা হবে। নদী না বাঁচলে শুধু চলনবিল নয় ,উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। নদী খননের নামে ৩/৪শ ফুত প্রশস্ত নদী ৮০ ফুট সরু খাল / ক্যানেল করা হচ্ছে। দখলদারদের আরো সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। চলনবিল এবং নদী বাঁচাতে কঠোর আন্দোলনের বিকল্প নাই।
তাড়াশ উপজেলার প্রবীণ সাংবাদিক, পরিবর্তন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, চলনবিলের খালসমুহ দখল- দুষণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব ফেলছে। পরিবেশ আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
বড়াইগ্রামের বড়াল আন্দোলনের নেতা  ডি এম আলম বলেন, চলনবিলের হারিয়ে যাওয়া, কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্য আমার দরকার। আমি বড়ালে পানি চাই। বড়ালে পানি আসলে পার্শ্ব খালও খনন হবে।
পাবনার বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ বলেন, আমরা দুই দশক ধরে ইছামতি উদ্ধার এবং খননের দাবিত আন্দোলন করে আসছি । দুই দশকের আন্দোলনের ফসল দখলদারদের উচ্ছেদের মাধ্যমে পুনরায় খননের কাজ শুরু হচ্ছে। চলনবিল বাঁচাতে হলে স্থানীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আমরা আন্দোলনের সাথে একাত্ম জানাচ্ছি।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য শাপলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এ জেড এম আশরাফ উজ জামান সভাপতির সমাপনী  বক্তব্যে বলেন, আন্দোলন করতে হলে আমাদের তথ্যে দরকার। তথ্য না থাকলে আন্দোলন সফল হবেনা। চলনবিলের রিসোর্স ব্যাক্তিদের নিয়ে যদি রিসোর্স টিম গঠন করতে পারি তাহলে আন্দোলন সফল হবে। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে রিসোর্স টিম গঠন করে তাদেরকে নিয়েই পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে