চলনবিলের নদী-নালা

0
385

প্রকৌশলী সাজিদুর রহমান সরদার: “চলনবিল প্রাকৃতিক সম্পদের এক ঐতিহ্যময় ভান্ডার” এমনি এক শিরোনামে আমি ”চলনবিল প্রবাহ”-তে লিখেছিলাম বেশ কয়েক মাস আগে। চলনবিলের জীববৈচিত্র অনন্য। অসংখ্য প্রজাতির মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ, পশু ও পাখির বিচিত্র বিচরণ, জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদের সুবিশাল সমারোহ, জেলে মাঝি বেদেসহ নানান সম্প্রদায় ও শ্রেণী পেশার মানুষের বসবাস, জীবনাচরণ, লোকজ গান ও সংস্কৃতি, বিনোদন, খেলাধূলা প্রভৃতি লোকঐতিহ্যে ভরপুর চলনবিল ছিল একদা অনন্য বৈশিষ্টমন্ডিত। কৃষি, শিক্ষায় ও যোগাযোগে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে সন্দেহ নাই। তবে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্টি কারণে, অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে আমরা এর অনেক সম্পদ হারিয়ে ফেলেছি এবং ক্রমান¦য়ে হারাতে বসেছি। আমি হাপিত্যেশ করার দলে নই। চলনবিল এলাকাসহ দেশে অনেক জ্ঞানী, গুণী ও বিদগ্ধ জন রয়েছে। আমাদের যে যার লেভেল থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, পাশাপাশি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাও চালাতে হবে যাতে করে অবশিষ্ট সম্পদ রক্ষা পায় এবং যতটা সম্ভব প্রকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে পুনরদ্ধার ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জানা দরকার আমাদের কি ছিল, কিআছে আর কি হারিয়েছি এবং কেন হারিয়েছি, কি তার প্রতিকার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা। যেমন ধরুন চলনবিলের অতীতে প্রকৃত আয়তন কত ছিল, কত গভিরতা ছিল, কি পরিমাণ পানি বর্ষা ও শুকনো মৌসুমে থাকতো এর ধারাবাহিক বিবর্তন ও হাল অবস্থা জানা দরকার। তেমনি এর নদী নালা খাল বিল ও সংযুক্ত বিলের মৎস্য সম্পদ, পশুপাখী, জলজউদ্ভিদ ও প্রাণী, লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সকল বিষয়ে State of the art I Trend Analysis সহ বিশদ সমীক্ষা ও গবেষনা পরিচালিত হওয়া একান্তই আবশ্যক এ গুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য। জাতীয় জীবনে উন্নয়ন অতি আবশ্যকীয়, তবে তা যেন আমাদের নদী, খাল, বিল, জলাশয় দখল ও ভরাট করে এর প্রবাহকে বাধা গ্রস্থ করে না হয় বা প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে না হয়।

যোগাযোগের জন্য রোড নেটওয়ার্ক ও ব্রীজ/কালভার্ট অপরিহার্য্য, তবে তা যেন বিলের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রবাহ অক্ষুন্ন রেখে পিয়ার কলামের উপরে continuous Bridge এর মাধ্যমে হয়। নদী খালের ফোরশোরসহ তার প্রসস্ততা না কমিয়ে মৎস্যসহ জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ এবং প্রতিবেশ রক্ষা করে নদী খালের নৌ-চলাচল ও বন্যা প্রবাহ অটুট রেখে তৈরীর প্রচেষ্টা যেন অব্যাহত থাকে। স্লুইস, রেগুলেটর, ড্যাম যদি করতেই হয় তবে তা যেন Fish Friendly, Navigation Friendly বা Environment Friendly হয়। অতীতে সরকারের সক্ষমতা কম ছিল। জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে তেমন ভাবার প্রয়োজন হয়তো তেমন অনুভুত হয়নি, কিন্তু এখন এগুলো আমাদের অস্তিতের জন্য, টিকে থাকার জন্যই নিশ্চিতভাবেই বিবেচনায় নিতে হবে।

নদী সিস্টেমের বাহিত পলি প্রথমে নদীর দুই পাড়ে জমা হয়। পরে খাল বা নালার মাধ্যমে ভূ-অভ্যন্তর ভাগে বিলের তলাভূমিতে প্রবেশ করে। দুই বা ততোধিক নদী বা খাল পরিবেষ্টিত নীচু জলমগ্ন ভূ-ভাগকেই আমরা সাধারনত বিল বলি। কাজেই পানির প্রবাহ ও জলমগ্নতা ব্যাতিরেকে বিলের বৈশিষ্ট থাকে না। চলনবিলকে টিকিয়ে রাখতে গেলে এর নদী নালা খালকে অতি অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

চলনবিলের প্রধান প্রধান নদী সিস্টেমগুলি হলো- বড়াল, নন্দকূঁজা, নারদ, গদাই, চিকনাই, মীর্জামাহমুদ, তুলশী, পচাবড়াল, ইছামতি প্রভৃতিসহ সকল খাল নালা জলাশয়। আত্রাই, গৌড়, গুরনাই, বারনাই, রক্তদহ, ছোটযমুনা, নাগর, নিয়ামত, বানগঙ্গা, ভাদাই, হান্ডিয়াল প্রভৃতিসহ সকল খাল নালা জলাশয়। বিলসূর্য, বান্নি, সাপদাইর, দুর্গাদহ, শালিখা, গোমতি. ভদ্রা প্রভৃতিসহ সকল খাল নালা জলাশয়। মরা করতোয়া, ফুলজোর, ইছামতি, হুরাসাগর, ভদ্রাবতি, সরস্বতী, মুক্তাহার, গোহালা, ঝবঝবিয়া প্রভৃতিসহ সকল খাল নালা জলাশয় প্রাথমিকভাবে বড়াল নদী সিস্টেম দিয়েই শুরু করা যাক।

বড়াল: বড়ালের উৎপত্তি রাজশাহী জেলার চারঘাট পয়েন্টে পদ্মা নদী থেকে। ঐতিহাসিকভাবে চারঘাট-বাগাতিপাড়া হয়ে লালপুর উপজেলার ধুপইল পয়েন্টে এসে এর নন্দকূঁজা শাখাকে বামতীরে (পশ্চিম-উত্তরমুখি) রেখে ফুলবাড়ি-ওয়ালিয়া-বনপাড়া-বড়াইগ্রাম-জোনাইল-নূননগর (নূননগর থেকে আর একটি শাখা অষ্টমনিষাতে গিয়ে গুমানী-আত্রাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে), ভাঙ্গুরা হয়ে ফরিদপুর উপজেলার সোনাহারাতে আত্রাই-গুমানীর সাথে মিলিত হয়ে ’বড়াল’ নাম নিয়ে বাঘা বাড়িতে এসে করতোয়া হুরাসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। অতঃপর হুরাসাগর নাম নিয়ে বেড়ার নাকালিয়াতে যমুনা নদীর উপর পতিত হয়েছে। চারঘাট থেকে বাঘাবাড়ী পর্যন্ত বড়ালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘‘বাংলাদেশের নদ নদী’’ বইটিতে সারদার চারঘাট থেকে ধুপইল-আটঘরিয়া-নাজিরপুর হয়ে গুরদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় পয়েন্টে আত্রাই গুমানির সংযোগ পর্যন্ত অংশকে আপার বড়াল এবং নূন-নগর হতে সোনাহারা হয়ে বাঘাবাড়ী পর্যন্ত অংশকে লোয়ার বড়াল বলা হয়েছে। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, মধ্যবর্তি ধুপইল হতে বনপাড়া-বড়াইগ্রাম হয়ে চাটমোহরের নূন-নগর পর্যন্ত মূল বড়ালের অংশের (মরা বড়াল নামে পরিচিত) কোন অস্তিত্ব এই বইটিতে নেই। এতে আপার বড়ালের সাথে লোয়ার লোয়ার বড়ালের কোন সংযোগ বা ধারাবাহিকতা নেই। আপার বড়ালের শেষ হয়েছে গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড়ে। অপরদিকে লোয়ার বড়াল শুরু হয়েছে চাটমোহর উপজেলার নূন-নগর থেকে অনেক যোজন দূরে।  আপার বড়ালের আটঘরিয়া থেকে নাজিরপুর হয়ে চাঁচকৈড় পর্যন্ত অংশ স্থানীয়ভাবে নন্দকূঁজা নামে পরিচিত। মেজর জেম্স রেনেল তাঁর Accounts of the Ganges and Burrampooter (Philosophical Transactions ১৭৮১) নামক গ্রন্থে বলেছেন, ”নাটোর থেকে জাফরগঞ্জ (বর্তমানে দৌলতপুর, মানিকগঞ্জ জেলায় সে সময় যমুনার সৃষ্টি হয়নি) পর্যন্ত ভূভাগের মধ্যবর্তি বিল ও নিম্নভূমির অবস্থান দেখে অনুমান করা যায় যে, পূর্বে গঙ্গা নদী রামপুর, বোয়ালিয়া দিয়ে পুঁঠিয়া, নাটোর হয়ে জাফরগঞ্জ, এরপর ঢাকা হয়ে ব্রহ্মপুত্র কিংবা মেঘনায় পতিত হোত।” এল এস এস ওম্যালী বলছেন, ”রেনেল সাহেবের এ বক্তব্য যদি সমর্থন করা হয় তবে গঙ্গার প্রবাহ পথটি ছিল প্রথমত নারদ এবং পরে বড়ালের খাত দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এটি পুঠিয়া, নাটোর, পাবনা হয়ে পূর্বের বর্ণীত পথে প্রবাহিত হোত”। প্রখ্যাত নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী তাঁর ”বড়াল নদের ইতিকথা” বইতে লিখেছেন, ধুপইল, ফুলবাড়ী, ওয়ালিয়া, বনপাড়া হয়ে বড়ালের মূল শাখাটি বর্তমানে প্রায় মৃত ও বিলুপ্ত হলেও গত শতকের প্রারম্ভে এটি ছিল প্রমত্তা ও ¯্রােতস্বিনী। সে সময় আটঘড়িয়ার পাশের গ্রাম নন্দকূঁজার পাশ দিয়ে বড়ালের একটি শাখা নন্দকূঁজা নামে শালিখায় নারদ নদের সাথে মিলিত হোত। ১৮৯৭ সালে যে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হয়েছিল তারই প্রভাবে মূল বড়ালের বাঁকে নদীর তলদেশ কয়েকফুট উর্ধ্বে উঠে যায় এবং এরই ফলে বড়ালের মূল ¯্রােত নন্দকূঁজা দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। বড়াল নদীতে এক সময় বারমাস পানি প্রবাহ থাকলেও বর্তমানে নদীর প্রবাহ মৌসুমী। বর্ষা মৌসুমে জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে পানি প্রবাহ বেশী থাকে এবং জানুয়ারী এপ্রিল মাস প্রবাহবিহীন থাকে।

মালঞ্চি অবস্থানে বড়ালের সর্বোচ্চ প্রবাহ বর্ষা মৌসুমে ২৩৭.০০ ঘনমিটার/সেকেন্ড এবং গভীরতা ৯.৫০ মিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ প্রায় ৩.১০ ঘনমিটার/সেকেন্ড। ধুপইল থেকে ওয়ালিয়া-বনপাড়া অংশের প্রায় পুরোটাই দখল ও ভরাটের কারণে বর্ষা মৌসুমেও প্রবাহ কম। এ কারণে নন্দকূঁজা পথেই এখন মূল বড়ালের সমূদয় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আটঘরিয়ার ভাটি থেকে কাছুটিয়া খালের সাথে খোর্দ-কাছুটিয়া মৌজায় মরাবড়াল অংশের সাথে যৎসামান্য সংযোগ থাকার ফলে কিছুটা পানি বড়াইগ্রাম থেকে জোনাইল চাটমোহর পথে প্রবাহিত হয় যার পরিমান নগন্য এবং পরিমাপের কোন ব্যবস্থা বাপাউবোর্ডের নাই।

বড়ালের গতিপথ: রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার ৫ ইউনিয়নে (পৌরসভা, চারঘাট, ভায়ালক্ষীপুর, সারদাহ, নীমপাড়া) ২১ মৌজার উপর দিয়ে এবং বাঘা উপজেলার ১ ইউনিয়ন (আড়ানি পৌরসভা) ও ৬ মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত; নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার ৫ ইউনিয়ন ( পাঁকা, জামনগর, বাগাতিপাড়া, বাগাতিপাড়া পৌরসভা, দয়ারামপুর) এর ৩২ মৌজার উপর দিয়ে; লালপুর উপজেলার ২ ইউনিয়ন (চংধুপাইল, ওয়ালিয়া) এর ১০ মৌজার উপর দিয়ে এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার ৬ ইউনিয়ন (বনপাড়া, বনপাড়া পৌরসভা, মাঝগাঁও, জোয়ারী, বড়াইগ্রাম পৌরসভা, বড়াইগ্রাম, জোনাইল) এর ১৯ টি মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত; পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার ৪ ইউনিয়ন (হরিপুর, বিলচলন, চাটমোহর, গুনাইগাছা এর ১৫ মৌজার উপর দিয়ে; ভাঙ্গুরা উপজেলার ৩ ইউনিয়ন (পাড় ভাঙ্গুরা, পৌরসভা, মন্দতোষা) এর ৬ মৌজার উপর দিয়ে এবং ফরিদপুর উপজেলার ২ ইউনিয়ন (ফরিদপুর পৌরসভা, বানওয়ারীনগর) ৩ মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত; পাবনা জেলার সাথিয়া উপজেলার ১ ইউনিয়ন (নাগড়ে মোড়া) এর ৩ মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত; সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার ২ ইউনিয়ন (পোতাজিয়া, রূপবাটি) এর ৯ টি মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত অর্থাৎ ৪ জেলার ১০ উপজেলার ৩১ ইউনিয়ন ও ১৩৪ মৌজার উপর দিয়ে বড়াল নদী প্রবাহিত।

নদীটির ১৩৪ মৌজার মধ্যে শাহজাদপুর উপজেলার ৯টি মৌজার প্রবাহ বারোমসি এবং এর বাইরে সবগুলি মৌজা এলাকার প্রবাহ কোথাও বা মৌসুমি আবার কোথাও বা মার্চ-এপ্রিল মাসে প্রবাহ আদৌ থাকে না, শুকিয়ে যায়। উৎসমুখে বড়ালের তলদেশের লেভেল প্রায় ১০ মিটার পিডব্লিউডি, প্রশস্ততা ১৪০-১৫০ মিটার। মালঞ্চি পয়েন্টে বর্ষায় গভীরতা ৯.৫০ মিটার ও শুষ্ক মৌসুমে ০.৫০ মিটার।পতিত মুখে বড়ালের তলদেশের লেভেল প্রায় (-) ৮.০০ মিটার পিডব্লিউডি এবং প্রশস্ততা প্রায় ৭৫০-৮০০ মিটার। ধুপইল পয়েন্টে মরা বড়ালের উৎসমুখে এর তলাদেশের লেভেল প্রায় ১২.৫০ মিটার পিডব্লিউডি।

সংযোগ নদী ও খাল: বড়ালের সাথে মোট ৫টি নদী ও ৫৪টি খালের সংযোগ অছে। উপজেলাওয়ারী তার বিবরণ নীচে দেয়া হলো- চারঘাট উপজেলায় ১০ টিসংযোগ খালঃ (১) মিয়াপুর খাল (২) জাহাঙ্গীরাবাদ খাল, (৩) বাটিকামারি খাল (৪) জোতরঘু খাল (৫) মজিদ জোয়াদ্দারবাড়ী খাল (৬) ধর্মহাটা ফকিরের মোড় খাল (৭) কালুহাটী মন্ডলপাড়া খাল (৮) কালুহাটী পূর্বপাড়া খাল (৯) হাবিবপুর খাল (৬) সমশেরবাড়ী খাল।

বাঘাউপজেলায় ৩ টি সংযোগ খাল: আড়ানী মৌজায়-কড়ইতলা খাল (২) নূরনগর মৌজায়-ভাঙ্গা সাাঁকো খাল (৩) নূরনগর মৌজায় খায়ের মিল খাল বাগাতিপাড়া উপজেলায় ১ টি শাখা নদী ও ৯ টি খাল: (১) হাঁপানিয়া মৌজায়-মুসাখান নদী (শাখা নদী) মারিয়া মৌজায়-মারিয়া খাল, (২) জামনগর মৌজায়-ঘোষপাড়া খাল, (৩) নূরপুর মৌজায়-কৃষি ও কারিগরি কলেজ সংলগ্ন খাল, (৪) মুরাদপুর মৌজায়-মুরাদপুর খাল, (৫) লক্ষনহাটা মৌজায়-ইউএনও পার্ক খাল, (৬) মিশ্রিপাড়া মৌজায়-জয়েন উদ্দিনের বাড়ী সংলগ্ন খাল, (৭) চিমনাপুর মৌজায়-শাহজাহান এর বাড়ী সংলগ্ন খাল, (৮) বাগাতিপাড়া মৌজায়-ভুমি অফিস সংলগ্ন খাল ও (৯) দয়ারামপুর মৌজায়-সমর লন্ডীবাড়ী সংলগ্ন খাল।

বড়াইগ্রাম উপজেলায় ১০ টি খাল: বনপাড়া পৌরসভায়-বাজার সংলগ্ন খাল, (২) খার্দো কাছুটিয়া মৌজায়-কাছুটিয়া খাল, (৩) কেলাø মৌজায়-কেল্লার জোলা, (৪) হারোয়া মৌজায়-হারোয়া উত্তরপাড়া খাল, (৫) নটাবাড়িয়া মৌজায়-কালিরঘুন বটতলা খাল, (৬) গোয়ালফা মৌজায়-গোয়ালফা দক্ষিনপাড়া খাল, (৭) বাগডোব মৌজায়-মাজার সংলগ্ন খাল (৯) চর গোবিন্দপুর মৌজায়-নতুনপাড়া খাল, (১০) বর্ণী মৌজায়-মিশনের পূর্ব পাশ খাল।

চাটমোহর উপজেলায় ৫টি সংযোগ খাল: সোন্দবা পুকুরপাড় মৌজায়-আলীর খাল, (২) বরুরিয়া মৌজায়-আক্কাসের খাল, (৩) ছোট শালিখা মৌজায়-নিশিপাড়া খাল, (৪) পৈলানপুর মৌজায়-বাচ্চুর বাড়ি সংলগ্ন খাল ও (৫) পূর্ব মথুরাপুর মৌজায়-মথুরাপুর খাল।

ভাঙ্গুরা উপজেলায় ৪ টি সংযোগ খাল: মেন্দা মৌজায়-সরদারপাড়া খাল, (২) মেন্দা মৌজায়-গার্লস স্কুল সংলগ্ন মেন্দা খাল, (৩) মেন্দা মৌজায়-মাহবুলা হলদারপাড়া খাল ও (৪) পাড় ভাঙ্গুরা মৌজায়- স্লইসগেট সংলগ্ন খাল।

ফরিদপুর উপজেলায় ২ টি সংযোগ খাল ও ১ টি নদী: ফরিদপুর মৌজায়-ডাকবাংলা সংলগ্ন খাল, (২) রাউদনাগদা মৌজায়-চিকনাই নদী ও (৩) দহকোলাডঙ্গা মৌজায়-ওয়াবদা খাল।

সাথিয়া উপজেলায় ২ টি সংযোগ খাল: পাথাইল মৌজায়-পাথাইলহাট খাল (ছোট) (২) পাথাইল মৌজায়-পাথাইলহাট খাল (বড়)

শাহজাদপুর উপজেলায় ৩টি নদী ও ১টি সংযোগ খাল: রাত্ততারা মৌজায়-ধলাই নদী, (২) সেলাচাপড়ী মৌজায়-করতোয়া বাঙ্গালী নদী (৩) লোচনা মৌজায়-ইছামতি নদী ও (৪) লোচনা মৌজায় লোচনা কাটা খাল।

চারঘাট, বাগাতিপাড়া ও লালপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে বড়ালের প্রবাহ পথে নাব্যতা সঙ্কট আছে। এটি ইওডঞঅ-এর কোন নৌপথ নয়। শুধুমাত্র সাথিয়া উপজেলার অংশটুকু নাব্য এবং বিআইডব্লিউটিএ-র নৌপথ ভূক্ত। মরাবড়ালের পুরো অংশই নাব্যতা সঙ্কেটে নিমজ্জিত। চারঘাট উপজেলার খায়ের মিল খাল, ঘোষপাড়া খাল, কৃষি ও কারিগরী কলেজ সংলগ্ন খাল, মুরাদপুর খাল, পার্ক সংলগ্ন খাল কয়টিতে বর্ষায় একটু পানি চলাচল করে, অন্য প্রায় সকল খালই ভরাট হয়ে গেছে। বড়াইগ্রাম উপজেলার কেল্লার জেলা খাল, চরগোবিন্দপুর নতুনপাড়া খাল কয়টি সচল আছে,অন্যগুলি ভরাটও অকার্যকর।

চাটমোহর উপজেলার আক্কাসের খাল, ভাঙ্গুরা উপজেলার সরদারপাড়া খাল ও পাড় ভাঙ্গুরা খাল এবং ফরিদপুর উপজেলার ডাকবাংলা সংলগ্ন খাল মোটামুটি কার্যকর আছে, অবশিষ্ট গুলো ভরাট ও দখলে অকার্যকর।

অবকাঠামো: বাপাউবোর্ড কর্তৃক বড়ালের উৎসমুখে চারঘাটে ৩ ভেন্ট রেগুলেটর, আড়ানী মৌজায় কড়ইতলা খালের মুখে স্লুইস, মরা বড়ালের মুখে ধুপইলে ১ ভেন্ট স্লুইস, আটঘরিয়াতে বড়ালের (নন্দকূঁজা শাখা) ওপর ৮ ভেন্ট রেগুলেটর, জামনগর মৌজায় ঘোষপাড়া খালের উপর স্লুইস, দখল উচ্ছেদের ব্যাপারে অজ্ঞ্যাত কারণে কালেক্টর অফিস হতে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয় হয়নি বা হচ্ছেনা। এই অংশটুকুসহ বড়ালের পূর্ণ অংশ ও এর সংযোগ নদী/খাল সমূহে দখল উচ্ছেদে কালেক্টর বা জেলাপ্রশাসকের নির্লপ্ততা লক্ষনীয়। আটঘরিয়া রেগুটেরের ওপেনিং নদীর প্রশস্ততা ও বাধাহীন প্রবাহের তুলনায় তুলনামুলক কম। এখানেও অনিয়নিন্ত্রত পরিচালন পরিলক্ষিত, কোন বোটপাশ হাপানিয়া মৌজায় মুসাখান নদীর উপর স্লুইস, নূরপুর মৌজায় কৃষি ও কারিগরী কলেজ সংলগ্ন খালের উপর স্লুইস ও মিশ্রিপাড়া মৌজায় জয়েন উদ্দিনের বাড়ী সংলগ্ন খালের উপর স্লুইস নির্মাণ করেছে। স্লুইসগুলো প্রথমত, নদীর প্রশস্থতার তুলনায় ওপেনিং কম, তদুপরী রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যবস্থার দূর্বলতার কারণে এগুলো অভীষ্ট সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। বড়াল ও এর সংযোগখালে ৮৯ টি ব্রীজ ও ১৮ টিকালভার্ট রয়েছে। এর অধিকাংশ গুলোই নদী/খালের প্রশস্ততার তুলনায় ছোট। এছাড়াও ব্যাপক বন্যা প্রবাহ এবং নৌচলাচলের উপযোগী Vertical Clearence এর প্রায় অধিকাংশ গুলোতেই নেই। বড়ালের উপর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন পরিচালিত এক সমীক্ষায় প্রায় ১২২৫ টি দখল ও ২৬ টি দূষণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। চাটমোহর ইপজেলার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি ও বিশিষ্ট নদী কর্মী জনাব মিজানুর রহমান বলেন, বড়ালের এক ধুপইল-ওয়ালিয়া-বনপাড়া অংশেই রয়েছে হাজারো দখল, এত কম সংখ্যক দখল কি করে সমীক্ষায় পাওয়া যায়? বাস্তবতা এই যে, নদীর প্রবাহ পথের কোন চিহ্ন এই অংশে না থাকায় সমীক্ষা দলের নিকট সেগুলি গোচরীভূত হয়নি। এ অংশে দখল চিহ্নিত করতে নাটোর কালেক্টর অফিসের সহযোগীতার প্রয়াজন হবে। দখল ও দূষণের বাইরেও বড়ালের বহুবিধ সমস্যা রযেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো নীচে উল্লেখ করা হলো- বড়ালের উৎসমুখে পদ্মায় শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ ব্যাপক হ্রাসপাওয়া। বড়ালের বেড লেভেল যেখানে ১০ মি: পিডব্লিউডিবি, পদ্মায় পানির লেভেল নেমে যায় ৭.৩০ মি: পিডব্লিউডিতে। কাজেই বর্ষার অব্যবহিত পরে পদ্মার পানি বড়ালে প্রবেশ করতে পারে না।

উৎসমুখে পদ্মা নদীর সাথে বড়ালের অবস্থান ৯০ ডিগ্রী কোণে অর্থাৎ আড়াআড়ি, যা পানি ঢোকার জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়। পদ্মার চারঘাট অংশে এটি একটি Anabranch এবং ভারতীয় বোর্ডারের প্রায় ৫০০ মিটারের মধ্যে। মূলপ্রবাহ পথ ভারতীয় অংশে পদ্মার অন্য শাখায় পরিবর্তিত হচ্ছে।

চারঘাট স্লুইসের ওপেনিং কম, ইনভার্ট লেভেলও উঁচুতে। কোন Navigation System বা Lock এতে সন্নিবেশ করা হয়নি এবং Migratory Fish এর জন্য Fish Pass  এর ব্যবস্থা এখানে রাখা হয়নি। মূল বড়াল যেটি এখন প্রায় মৃত এর উৎসমুখ ধুপইলে ১ ভেন্ট রেগুলেটর স্থাপন এবং প্রবাহ অক্ষুন্ন রাখায় বোর্ড হতে প্রথম থেকেই কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। নদীর জমি হস্তান্তরযোগ্য নয় জেনেও ডিজিএলআর ও নাটোর কালেক্টর কর্তৃক এর জমি ব্যাক্তি মালিকানায় প্রদান করা হয়েছে, আরএস মৌজায় কিছুটা নদীর জমি থাকলেও ধুপইল-ওয়ালিয়া-বনপাড়া অংশে পূর্ণমাত্রায় দখলের কারণে নদীর কোন চিহ্ন সেখানে পাওয়াই দুষ্কর।

বর্ণিত নদীখাল ছাড়াও বড়ালের অববাহিকায় অসংখ্য খাল, নালা ও বিল রয়েছে যে গুলোতে সংযোগ অনেক স্থানেই বিচ্ছিন্ন বা অপর্যাপ্ত। এগুলোর পুর্ণ তালিকা ও মানচিত্র নাই। সিএস মৌজা ম্যাপে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে নাই, দখলে ভরাটে হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বিল, জলাশয়, নালা, খাল প্রভৃতির উপর দিয়ে অপ্রশস্ত ও অপরিকল্পিত ব্রীজ/কালভার্ট এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র, পরিবেশ ও প্রতিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
কৃষি ব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির অতি উত্তোলন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার করা নদী দূষণের অন্যতম কারণ। নদী/খাল/বিলের মাস্টার প্লান ও মানচিত্র তৈরি করে যথাযথ সমীক্ষার মাধ্যমে সামগ্রিকতার (Holistic Approach) ভিত্তিতে বর্ষায় অতিরিক্ত বন্যার পানি প্রবাহ ও ধারণ এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি ধরে রাখার নিমিত্তে অগ্রধিকার ভিত্তিতে খনন করা হচ্ছে না।

কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, নৌ-পরিবহন প্রভৃতি খাতে বিদ্যমান পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও প্রাপ্ত পানির সুষম বন্টন নিশ্চত না করায় এবং দূষণ, দখল, নব্যতা সংকট, ভাঙ্গন, বন্যা, খরা প্রভৃতি মোকাবেলায় যথোপযুক্ত কার্যসম্পাদন বা নদী ব্যবস্থাপনা তথা পানি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বড়াল বেসিনের সকল খাল, নালা, বিল বা জলাশয় বিবেচনায় নিয়ে শুস্ক মৌসুমে কৃষি, নৌ-পরিবহন, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র রক্ষায় পানি উন্নয়ন ও সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সামগ্রিক এ্যাপ্রোচ বিবেচনায় না নেওয়া। Institue of Water Modelling পরিচালিত সমীক্ষা অপর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বড়াল রক্ষায় করণীয়: যৌথ নদী কমিশনের সভায় আলোচনা করে বড়ালের উৎসমুখে পদ্মা নিয়মিত খনন এবং উৎসমুখে বড়ালের এলাইনমেন্ট ৩০০ হতে ৪৫০ কোণে নির্বাচন করতে হবে। ধুপইলে নির্মীত স্লুইস গেটটি অপসারণ এবং চারঘাটে ও আটঘড়িয়ায় স্থাপিত রেগুলেটরের ওপেনিং নদীর প্রশস্ততায় নির্ধারণ করতে হবে। সিএস আনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণ ও উচ্ছেদে কালেক্টর/জেলা প্রশাসকের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণ। তিনি সিএস অনুযায়ী নদীর জমি ঝঅঞঅ-১৯৫০ এর ১৪৪ ধারা অনুযায়ী আরএস/বিএস ভূমি জরিপে ব্যক্তির নামে প্রদত্ত বন্দোবস্ত ১৪৯(৪) ধারা অনুযায়ী জরুরী ভিত্তিতে বাতিল করবেন যা প্রতারণামূলক লিখন বলে গণ্য এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে থাকলে ঝঅঞঅ-১৯৫০ এর ৮৬, ৮৭ ধারা প্রয়োগে দিয়ারা জরিপ সম্পাদন করবেন। কালেক্টর বাহাদুর সকল সিএস ও আরএস মৌজা ম্যাপ রেকর্ডরুমে প্রাপ্তি নিশ্চিত করবেন ও রেকর্ড অব অর্ব রাইটসসহ সমুদয় রেকর্ড ও ম্যাপ ওয়েবসাইটে পাবলিশ নিশ্চিত করবেন। বাপাউবো অন্যান্য সংস্থার সহযোগীতায় বড়ালে ও তার শাখা সমূহে পানি প্রবাহ ও সেডিমেন্ট প্রবাহসহ Water Balance Study সম্পাদন করবে এবং Environment Flow নিরূপন করবে। জনজীবনে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা ও জরুরী দখল বন্ধ করণে সিআরপিসি এর ১৩৩ ধারার প্রয়োগ করায় জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। Integrated Study ব্যতিরেকে জলাশয় ও প্লাবনভূমির উপর দিয়ে রাস্তা-বাধ কিংবা ব্রীজ/কালভার্ট/স্লুইসগেট নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং নদী খালের প্রশস্ততা, সর্বোচ্চ প্রবাহ ও নৌ-পরিবহনের বিষয় গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। দহগুলিতে মাছের বিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং নির্মিত বন্যা বাঁধের দেশ কূলের ঢালে বৃক্ষরোপন ও সামাজিক বনায়ন এবং পশু-পাখীর অভয়াশ্রম বানাতে হবে। দখল রোধে শহর, বন্দর, বাজার ও লোকালয়গুলোতে বাঁধের টো-লাইন বরাবর ফোরশোরের বাইরে দিয়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে।

লেখক: সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ড
বিশেষজ্ঞ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে