চলনবিলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমএ বারী স্যারের  আজ  ১১ তম মৃত্যু বার্ষিকী

0
617

স্টাফ রিপোর্টারঃ   চলনবিলের কৃতি সন্তান , বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,   ঐতিহ্যবাহী বড়াইগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক,  প্রথিত যশা ব্যক্তিত্ব  মোঃ আব্দুল বারী  এম .এ বি. এড. স্যারের   ১১ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ ।   ১৯৩৩সালের ১লা মার্চ গুরুদাসপুর উপজেলার খাকড়াদহ  পূর্ব কান্দি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর  পৈতৃক নিবাস  কচুগাড়ী  গ্রামে। তাঁর বাল্যশিক্ষা এবং বেড়ে ওঠা ছিল কচুগাড়ী গ্রামে।  কচুগাড়ীর বিখ্যাত ফকির বংশের সন্তান ছিলেন তিনি।  এজন্য দেশ বিদেশের সবাই তাঁকে কচুগাড়ীর সন্তান  হিসেবেই চিনতেন। ফকির বংশের তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ।  তার পিতার নাম   মরহুম রজব আলী ফকির  এবং মাতার নাম খোশবুতুন্নেসা ।  তার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি  হয় কচুগাড়ী নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ক্লাস টু  পর্যন্ত  পড়ালেখা শেষ করে ১৯৪০ সালে ধারাবারিষা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে  ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে  প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন  এবং মাসিক ২ টাকা করে বৃত্তি পান। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে  তিনি  চাঁচকৈড় নাজিমউদ্দিন উচ্চ  বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ।  ১৯৪৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে  ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় চাঁচকৈড় নাজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । তাঁর শিক্ষকসুলভ মনোভাব লক্ষ্য করে তৎকালীন নাজিমুদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল করিম  তাকে রেজাল্ট বেরোনোর আগেই উক্ত   স্কুলে শিক্ষকতা করার জন্য আহবান জানান। শিক্ষকের কথা তখন তিনি ফেলতে পারেননি। তিনি শুরু করেন শিক্ষকতা।  কিন্তু  তার ছিল উচ্চ শিক্ষা লাভের উচ্চাকাঙ্খা। তাই তিনি পরবর্তীতে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন   উচ্চ  মাধ্যমিক পড়ার জন্য। তিনি কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করার পর একই কলেজ থেকে সালে  (বি.এ) পাশ করেন। পড়ালেখার মাঝে তিনি শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন বিধায় ধারাবাহিকভাবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে   পারেননি।   এরপর তিনি  বি.এড  পরীক্ষায় পাশ করেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে  থেকে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে মাষ্টার্স সম্পন্ন করেন।

সে সময়  এ এলাকার জনগণ ছিল অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত । সেই  অন্ধকারাচ্ছন্ন  যুগে শিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে করে তিনি আসেন  এই বড়াইগ্রামে । একটি জাতির সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত রচনার প্রধান উপায় হলো শিক্ষা । শিক্ষার আলোর পরশে একজন ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠেন।  ১৯৪৮ সালে চাঁচকৈড় নাজিমউদ্দিন হাইস্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক হিসাবে যোগদানের মধ্যদিয়ে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম , মানবতা ,সৎ সাহস ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশ ঘটানোর চ্যালেন্জ তিনি গ্রহণ করেন । ১৯৫১ সালে তিনি গুরুদাসপুর হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন ।  গুরুদাসপুর পাইলট হাইস্কুল থেকে তিনি কাছিকাট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন ১৯৫৫-৫৬  সালে ।  তিনি ১৯৫৮  সালে বড়াইগ্রামে  হাইস্কুল প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।  তিনি ১৯৫৮ সালের ১ লা মে থেকে ১৯৯৮ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বড়াইগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। মাঝখানে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি বিদ্যালয় থেকে  ছুটিতে ছিলেন।   এরপর আবার ফিরে আসেন শিক্ষকতায় । তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছেন। তিনি যে সকল বিদ্যাপীঠ তৈরী করেছিলেন সেই সব প্রতিষ্ঠান আজ একেকটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে । তিনি ১৯৭২ সালে বড়াইগ্রাম কলেজের   প্রতিষ্ঠাতা  অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং   ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত  এই কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।  একই সাথে ইংরেজী বিষয়ে শিক্ষকতা করেন ।   তিনি  ১৯৭৯ সালে  বড়াইগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া  উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে বনপাড়া বেগম রোকেয়া গার্লস হাইস্কুল,    বনপাড়া ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠায়  তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৪ সালে   নিজ গ্রাম কচুগাড়ীতে “কচুগাড়ী ফকির বাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়”  প্রতিষ্ঠায় তার বিশেষ অবদান  ছিল।

শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি লক্ষীকোল বাজারে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করতেন। শেষ বয়সে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে নানা অসুখে আক্রান্ত হন। বিশেষ করে চোখের গ্লুকোমার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন । অসুস্থ অবস্থায় তাকে ১ লা ফেব্রুয়ারি বগুড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবশেষে ২০১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী ভোরে  তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার ১২ ছেলে ও ৪ মেয়ের অধিকাংশই  উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। সবাই সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন জায়গায় উচ্চপদে  আসীন। কেউ কেউ কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন । এ ছাড়া  দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার হাজারো  ছাত্র-ছাত্রী।  বারী স্যার আজ আমাদের  মাঝে নেই কিন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন তার রেখে যাওয়া অমর কীর্তিগুলোর মাঝে। আমরা স্যারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে