চলে গেলেন চলনবিলের প্রতিথযশা শিক্ষক জনাব আলী আক্কাস মিয়া

0
619

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ  চলে গেলেন গুরুদাসপুরের প্রতিথযশা শিক্ষক ও আলোর দিশারী জনাব মোঃ আলী আক্কাস মাষ্টার। জীবন যুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করে গত ১৪ জুলাই রাত ১১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়েসহ বহু আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন । তিনি আক্কাস মাষ্টার নামেই এলাকায় সমধিক পরিচিত ছিলেন।

বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী আলী আক্কাস নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার শিকারপুর গ্রামে ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন।  তার পিতার নাম ছিল   মোঃ আয়েজ উদ্দিন সোনার  এবং  মাতা ছিলেন  রওশন আরা। নিজ গ্রাম শিকারপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার নিকরদিঘী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৫৮ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং নাটোর নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলেজ হতে ১৯৬১ সালে আই কম এবং ১৯৬৩ সালে বি কম ডিগ্রী লাভ করেন । পরবর্তিতে তিনি রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি এড ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানার রশিদপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে মৃত জহির উদ্দিন সরদার এর প্রথম কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

কর্মজীবনে তিনি এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুনামের সহিত শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি খুবজীপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং নাজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর গুরুদাসপুরে বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে উক্ত কলেজে তিনি এ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে আসেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে কুন্দইল বিলচলন বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়, বৃ-পাথুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং  ধারাবারিষা উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর পুনরায়  তিনি  ১৯৮০ সালে খুবজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার সাথে তিনি অত্র বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তার সময়ে খুবজীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, ভালো ফলাফল এবং অবকাঠামোগত অনেক উন্নতি লাভ করে এবং বিদ্যালয়টি বিশেষ সুনাম অর্জন করে। এরপর তিনি ২০০৬ সালে খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ইংরেজী শিক্ষক। ইংরেজীতে তার অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তিনি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ইংরেজির প্রধান পরীক্ষক ছিলেন।

অবসরের পরে তিনি তাবলিগ জামাতের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে দ্বীন প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি এলাকার শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও মানবিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।তিনি হজ্বব্রত পালন করেন। এলাকায় মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ,মাদ্রাসা ও কবরস্থান প্রতিষ্ঠায় তিনি জোড়ালো ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই মাসে ৩ তারিখে তার শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। প্রাথমিক চিকিত্সায় উন্নতি না হওয়ায় ৬ তারিখে তাঁকে ঢাকার বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ এন্ড হোপ স্পেসালইজ্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে পরের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি করা হয় । তার শারীরিক অবস্থার আরো  অবনতি হলে ৯ তারিখে তাকে কোভিড আইসিইউতে ভর্তি করা হয় এবং পাঁচদিন জীবন যুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন। এর মধ্য দিয়ে চলনবিলের একজন আদর্শ শিক্ষকের কর্মবহুল জীবলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। শিকারপুর আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে   তার  জানাজা শেষে শিকারপুর গোরস্থানে  তাকে দাফন করা হয়।

শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে নেওয়া এই মহান শিক্ষাগুরু সরকারী চাকুরিও উপেক্ষা করেছেন। ব্যক্তি জীবনে সততা ও নিয়মনিষ্ঠার উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন । উল্লেখ্য তার বড় ছেলে অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আনোয়ারুল করিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্বের পাশাপাশি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং বাবার প্রজ্জ্বলিত আলো বহনের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

 

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে