জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড মোকাবেলায় প্রয়োজন ‘সুসমন্বিত রোডম্যাপ’

0
80

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় একটি ‘সুসমন্বিত রোডম্যাপ’ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে ‘অনুঘটকের ভূমিকা’ পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, কোভিড-১৯ সংকট মোকাবেলায় আমাদের একটি সুসমন্বিত রোডম্যাপ দরকার। এ সংকট দূর করতে ২০৩০ সালের এজেন্ডা, প্যারিস চুক্তি এবং আদ্দিস আবাবা অ্যাকশন এজেন্ডা আমাদের ব্লুপ্রিন্ট হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে জাতিসংঘকে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে হবে। মঙ্গলবার ‘কোভিড-১৯ এর সময়ে এবং পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল সভায় দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশনের সাইডলাইনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ছয় দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-

‘প্রথমত জি-৭, জি-২০, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত সংস্থাভুক্ত (ওইসিডি) দেশগুলো, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউটগুলোর (আইএফআইএস) বার্ষিক প্রণোদনা, ছাড়ের অর্থ এবং ঋণ মওকুফের পদক্ষেপ বৃদ্ধি করা উচিত। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে অবশ্যই তাদের ৭ শতাংশ ওডিএ প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।’

‘দ্বিতীয়ত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আরও বেশি বেসরকারি অর্থ ও বিনিয়োগ সরিয়ে আনা প্রয়োজন। ডিজিটাল বিভাজন বন্ধ করার জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে আরও কাজে লাগাতে হবে।’

‘তৃতীয়ত কোভিড-পরবর্তী জব মার্কেটের জন্য অভিবাসী শ্রমিকদের সহায়তা করে রেমিটেন্স প্রবাহের নিম্নমুখী প্রবণতা ফিরিয়ে আনতে নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজন।’

‘চতুর্থত উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে অবশ্যই শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত বাজারে প্রবেশ, প্রযুক্তি সমর্থন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও প্রবেশযোগ্য অর্থায়নের বিষয়ে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।’ ‘পঞ্চমত কমপক্ষে ২০৩০ সাল নাগাদ মহামারীর কারণে সম্ভাব্য পেছনে পড়া রোধ করতে এলডিসি থেকে উত্তরণ লাভকারী দেশগুলোর জন্য নতুন আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা থাকতে হবে।’ ‘সর্বশেষ জলবায়ু সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে অর্থায়নের জন্য আরও জোর প্রচেষ্টা করা দরকার।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, কোভিড-১৯ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশ সমতুল্য ১৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। তিনি বলেন, নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কর্মসূচিগুলোর আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি এ মহামারী চলাকালে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী ও সাংবাদিকসহ তিন কোটিরও বেশি মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে সরকার।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সভা আহ্বানের জন্য কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, জামাইকার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ড্র– হলনেস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে ধন্যবাদ জানান। শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নের জন্য অর্থায়নের ছয়টি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগের সূচনা অত্যন্ত সময়োচিত। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, আমাদের প্রতিশ্রুতিগুলো কাজে পরিণত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ক্লিনিক বর্জ্য নয় সব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে : শুধু ক্লিনিক (মেডিকেল) বর্জ্য নয়, সব ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাস, নৌ, বিমান বা যে কোনো স্টেশনের বর্জ্য অপসারণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এ কাজে যেসব সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন প্রকল্প-১ নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন দিতে গিয়ে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

একনেক বৈঠকে মৌজা ও প্লটভিত্তিক জাতীয় ডিজিটাল ভূমি জোনিংসহ চার প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে ৭৯৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৬২৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ১৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

পরিকল্পামন্ত্রী মান্নান আরও জানান, নৌপথের বর্জ্য অপসারণে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া যেখানে-সেখানে শিল্প স্থাপন করা যাবে না।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপন করতে হবে। সেখানে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, রাস্তাসহ সব ধরনের সুবিধা রয়েছে। নদীর পার দখলমুক্ত করতেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।

একদিকে পার অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং অন্যদিকে কচুরিপানামুক্ত করে ড্রেজিং করতে বলেছেন তিনি। ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব আসাদুল ইসলাম, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম, পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য জাকির হোসেন আকন্দ এবং ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামীমা নার্গিস, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ইয়ামিন চৌধুরী প্রমুখ।

ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী মান্নান আরও বলেন, বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্প-১ নির্মাণ প্রকল্পের বিদেশ সফরের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব ছিল সাড়ে ৪ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্য সেটি কমিয়ে ৭০ লাখ টাকা করেছে।

পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিদেশ সফরের ব্যয় কমানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্রামে যত মামলা, হাঙ্গামা, খুনখারাবি তার বেশির ভাগই হয় জমিকেন্দ্রিক। ডিজিটাল ভূমি জোনিং হলে এ সমস্যা দূর হবে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত কমে যাবে। এছাড়া জোনিং হলে জমির চরিত্র কী, তা সহজে জানা যাবে। জমি খাস, অর্পিত, আবাদি নাকি জলাভূমি, তা সব সহজে জানা যাবে।

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হল- ১৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্প-১ নির্মাণ, ৩৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার মৌজা ও প্লটভিত্তিক জাতীয় ডিজিটাল ভূমি জোনিং প্রকল্প, ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ভৈরব নদ পুনঃখনন প্রকল্প।

এছাড়া নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চাটখিল, সেনবাগ ও সোনাইমুড়ি উপজেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষ্যে খাল পুনঃখনন প্রকল্প। এ প্রকল্পের ব্যয় ৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

নিরাপদ বিশ্ব গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে : বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

এতে তিনি লিখেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এগুলো মোকাবেলায় একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তুলতে মানবজাতিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে: ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। আমাদের এমন কিছুই করা উচিত নয়, যার জন্য আফসোস করতে হয়।’

প্রধানন্ত্রী বলেন, ‘আমার দেশ নদীমাতৃক দেশ। উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বহু লোক বাস করে। কিন্তু ২০২০ সালে আমাদের কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মে মাসে সাইক্লোন আম্পান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হেনে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে গেছে। এরপর মৌসুমি বৃষ্টিপাতে দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি সেসব দেশকে সতর্ক করতে চাই, যারা মনে করে তারা জলবায়ু সংকট থেকে মুক্ত, তারা কিন্তু রেহাই পবে না। কোভিড-১৯ দেখিয়েছে কোনো দেশ বা ব্যবসা একা টিকে থাকতে পারে না।’

নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রকৃতির ক্রোধ বাংলাদেশ একা অনুভব করছে না। এ বছর আমাজন, অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া এবং সাইবেরিয়ায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় এবং হ্যারিকেন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যারিবিয়ান এবং এশিয়ার বেশির ভাগ অংশে আঘাত হেনেছে।’

তিনি বলেন, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে অনেক ছোট ছোট দ্বীপ এবং উপকূলীয় দেশ ডুবে যাবে। গলে যাওয়া হিমবাহ অনেক দেশে বিপর্যয় ডেকে আনবে। কয়েক কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর নেই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জি-২০ দেশগুলো প্রায় ৮০ শতাংশ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী এবং নিচের দিকের ১০০টি দেশ মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নির্গমন করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি রোধ করতে নিঃসরণকারী দেশগুলোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে