টিকিট-টোকেনের জন্য অবরোধ ভাংচুর :সৌদি প্রবাসীদের অন্তহীন দুর্ভোগ

0
98

সৌদি আরব যাওয়ার টিকিট ও টোকেনের দাবিতে রোববারও হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ প্রবাসী রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন। দুই দিন বিরতির পর এদিন সকাল থেকে ফের সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ে নামেন নারী ও পুরুষরা।

একপর্যায়ে কিছু প্রবাসী সোনারগাঁও হোটেলের সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা হোটেলের ফটক ভেঙে সৌদি এয়ারলাইন্সের অফিসের সামনে অবস্থান নেন।

এ সময় তারকামানের হোটেলটি একপাশ লোকেলোকারণ্যে পরিণত হয়। পরে পুলিশ এসে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে প্রবাসীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। পুলিশকে মৃদু লাঠিচার্জ করতে দেখা গেছে।

কিন্তু এরপরও প্রাবাসীরা অবস্থান ছাড়েননি। দিনভর অবরোধের পর বিকালে সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ভিসার মেয়াদ অনুযায়ী টোকেন-টিকিট দেয়ার সিদ্ধান্ত জানায়।

তাদের হাতে নির্ধারিত ফরম দেয়া হলে তারা অবরোধ তুলে হোটেল চত্বর থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কথায় আশ্বস্ত হতে না পেরে তারা আবার সার্ক ফোয়ারা ও কারওয়ান বাজার এলাকায় রাস্তায় অবরোধ তৈরি করেন।

পুলিশ এসে বোঝানোর পর ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান শেষে তারা বাড়ি ফিরে গেছেন। বিক্ষোভের সময় কিছু নারী, শিশু ও পুরুষকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে। পরে অন্যরা তাদের সরিয়ে নিয়েছেন।

এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে এ দুর্ভোগ বলে দাবি করেন প্রবাসীরা। মতিঝিল বিমান অফিসের সামনে এদিন কোনো বিক্ষোভ হয়নি। প্রত্যাশীদের মধ্যে ১০ শতাংশ লোক টোকেন ও টিকিট পেয়েছেন।

এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর সৌদি এয়ারলাইন্স ঘোষণা দেয়, ৪ অক্টোবর নতুন টোকেন দেয়া হবে। এদিন ৪৫০ জনকে টোকেনের জন্য ডাকা হলেও হাজির হন ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার মানুষ।

২৪ সেপ্টেম্বর থেকে টোকেনের মাধ্যমে টিকিট দেয়া শুরু করে সৌদি এয়ারলাইন্স। সর্বশেষ ১ অক্টোবর ৩০০১ থেকে ৩৩০০ টোকেনধারীদের টিকিট দেয় সংস্থাটি। শুক্রবার থেকে তারা কোনো টোকেন ইস্যু করেনি।

এদিকে সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর রোববার সকালে আবারও টিকিট বিক্রির জন্য টোকেন দেয়া শুরু করেছিল। এ কার্যক্রমটি শুরুর পরপরই বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা কার্যালয় ঘেরাওয়ের পর হট্টগোল শুরু করে।

ফলে টোকেন দেয়ার পরিস্থিতি আর ফিরে আসেনি। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার হাফিজ আল ফারুক জানান, হাজার হাজার প্রবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ করছিল।

আমরা (পুলিশ) পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছি। অনেকে দেয়াল টপকে আবার অনেকে গেট ভেঙে ভেতরে অবস্থান নেয়। সাউদিয়ার পরামর্শে আমরা ফরম বিতরণ করেছি। প্রবাসীদের মধ্যে অনেক নারীও এসেছেন।

সৌদি এয়ারলাইন্সের জিএম জাহিদ হোসেন রোববার জানান, এখন থেকে ভিসার মেয়াদ অনুযায়ী টিকিট রি-ইস্যু করবে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স। তিনি বলেন, রোববার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে প্রবাসীদের ফরম দেয়া হয়েছে।

সেই ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে জমা দিতে বলা হয়েছে। ফরমে ভিসার মেয়াদ, পাসপোর্ট ও মোবাইল নম্বর লিখতে হবে। ফরমে ভুল থাকলে নেয়া হবে না। ফরম দেখে পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে মেসেজ দেয়া হবে।

ফরম যাচাই-বাছাই শেষে যাদের ভিসার মেয়াদ আগে শেষ হবে, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগেই টিকিট পাবেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে দেড় হাজার টোকেন দেয়া হবে।

যদিও এতদিন সৌদি এয়ারলাইন্স রিটার্ন টিকিটের মেয়াদ ধরে টিকিট রিইস্যু করেছে। টিকিট ক্রয়ের তারিখ ধরে এবং সিরিয়াল অনুযায়ী টিকিট দেয়া হয়েছিল।

জানা যায়, সৌদি থেকে ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েন প্রায় ৮০ হাজার প্রবাসী কর্মী। ৭-৮ মাস পর কাজে ফিরে যাওয়ার সুযোগ এলেও ফ্লাইটের অভাবে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

হাজার হাজার প্রবাসী বাধ্য হয়ে গত সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন।

টানা তিনদিনের বিক্ষোভের পর ২৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের ইকামার (সৌদি আরবে কাজের অনুমতি) মেয়াদ আরও ২৪ দিন বৈধ থাকবে এবং প্রয়োজনে আরও সময় বাড়ানো হবে।

এরপর থেকেই সৌদি এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানের মতিঝিল কার্যালয় থেকে টিকিট দেয়া শুরু হয়। ২৯ ও ৩০ মার্চের রিটার্ন টিকিটের যাত্রীদের এ টিকিট দেয়া হয়।

প্রবাসী নারী কর্মী সৈয়দা মঞ্জুয়ারার দম ফেলার ফুরসত নেই। সঙ্গে তিন বছরের কন্যাশিশু। অধীর অপেক্ষায় বসে আছেন, কখন তাদের নাম ডাকা হবে।

হাতে পাবেন সাউদিয়ার (সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স) টিকিট-টোকেন। মঞ্জুয়ারার মতো হাজার খানেক প্রাবসী নারী-শিশুও টোকেন-টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

আর পুরুষের সংখ্যা হবে ২০-২১ হাজার। বিকাল পৌনে ৩টার দিকে বিক্ষুব্ধ প্রবাসীদের হাতে ফরম দেয়া শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা। সেই ফরমে ভিসার মেয়াদ, পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন নম্বর লিখে জমা দিতে বলা হয়।

এ সময় ফরম নিতে কাড়াকাড়ি শুরু হয়। কেউ আবার ফরম নিলেও লিখতে না পাড়ায় সমস্যায় পড়েন।

ফরম বিতরণের সময় কাড়াকাড়ি শুরু হলে নারী ও শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একটি ফরমে ২০ জনের নাম, তথ্য ও মোবাইল নম্বর লেখার জন্য মাইকে ঘোষণা করা হয়।

ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হওয়ায় অনেকের ফরম ভিজে যায়। আবার অনেকে ফরম পেলেও নাম ও তথ্য-উপাত্ত না লিখতে পারায় ঝামেলায় পড়েন। এ সময় অনেক পুলিশ সদস্য ও মিডিয়া কর্মী প্রবাসীদের ফরম পূরণ করে দিয়েছেন।

নোয়াখালী থেকে আসা ফরিদা বেগম জানান, তিনি ফরম পেলেও নিজে লিখতে পারেননি। একজন পুলিশ সদস্য তার ফরমটি পূরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু এতে ২০ জনের নাম না থাকায় জমা দিতে পারছেন না।

মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, প্রতিটি ফরমে ২০ জনের নাম থাকতে হবে, অন্যথায় জমা নেয়া হবে না।

সরেজমিন দেখা গেছে, হাজার হাজার প্রবাসী রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে শুধু টিকিট-টোকেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। আশপাশে খাবারের দোকান না থাকায় নারী-শিশুদের বেশি দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে।

যশোর থেকে আসা আসমা বেগম জানান, ৪ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ভোরে এসেছেন। সঙ্গে টাকা থাকলেও কিছু খেতে পারেননি। দুপুরের দিকে এক হকারের কাছ থেকে বিস্কুট আর আমড়া কিনে খেয়েছেন মা-ছেলে।

টয়লেটের অভাবে প্রবাসী নারীদের অশেষ কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। ভোলা থেকে আসা হিরণ মিয়া ক্ষোভ উগরে বললেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্টরা যদি তাদের কিছু খাবার বিতরণ করত, তাহলে এত কষ্ট হতো না।

ফরম বিতরণ আর সড়ক অবরোধের সময় কিছু নারীসহ পুরুষ প্রবাসীকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে। বরিশাল থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, তিনি অসুস্থ। স্বামী সৌদি আরবে থাকেন।

তিনিও সঙ্গে ছিলেন। রিটার্ন টিকিট কেটে দেশে এসেছিলেন। এখন টিকিট পাচ্ছেন না।

এদিকে দেশে এসে আটকে পড়া প্রবাসীদের ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সাউদিয়া ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়েছে উভয় প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া বিমান প্রবাসীদের ফেরাতে সৌদির তিন শহরে মোট ১২টি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তারপরও প্রবাসীদের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাউদিয়ার এক কর্মকর্তা জানান, যারা টিকিট পাবেন, তাদের করোনা টেস্টের নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়েই ভ্রমণ করতে হবে। কিন্তু যতক্ষণ প্রবাসীরা বিক্ষোভে ছিলেন, সামাজিক দূরত্ব ছিল না। অনেকের মুখে মাস্কও ছিল না।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে