ঢালিউডে চিরসবুজ পারভেজ ভ্রাতাত্রয়ী

0
178

ফাত্তাহ তানভীর রানা :  বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নামের শেষ অংশে পারভেজ রয়েছে এমন তিনজন বিখ্যাত মানুষ আপন তিন ভাই। তাঁরা তিনজন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা),কামাল পারভেজ ও মাসুম পারভেজ রুবেল; আমি তাঁদের কথাই বলছি। এই তিনজনের মধ্যে কামাল পারভেজের মুখটি দর্শকদের কাছে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত । তা হলেও তিনিই বা  কম কিসে?অভিনয় কম করলেও তিনি বেশ কিছু সফল সিনেমা প্রযোজনা করেছেন। কামাল পারভেজ বাংলাদেশের প্রযোজকদের মধ্যে খুবই নামকরা। আর মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা প্রযোজক-পরিচালক হয়ে সিনেমায় আসলেও পরে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তিনি ঢাকাই ছবির অন্যতম সেরা নায়ক হয়ে যান। নায়ক সোহেল রানা ড্যাশিং হিরো এবং নায়ক রুবেল অ্যাকশন কিং হিরো হিসেবে সুপরিচিতি পেয়েছেন। নায়ক সোহেল রানা পড়েছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে, নায়ক রুবেলও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। এই ভ্রাতাত্রয়ীর পৈতৃক নিবাস বরিশাল। নায়ক রুবেল নায়ক হয়ে আসাটা এই দেশের অ্যাকশন ছবির ক্ষেত্রে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশের সেলুনে, দোকানে অথবা তরুণ’রা যেখানে অমিতাভ বচ্চন-ব্রুসলির ছবি ঝুলিয়ে রাখতেন, সেখানে এঁদের পাশাপাশি রুবেলের নায়ক হিসেবে আবির্ভাবের পর রুবেলের ছবিও শোভা পেতে শুরু করে। সিনেমায় রুবেল গায়ক বা সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করলেও অ্যাকশন কিং হিরো হয়ে যান খুব কম সময়ের ব্যবধানেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ এঁদের কেউ নন; তিনি প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের সহোদর। বিখ্যাত গায়িকা শাহনাজ রহমতুল্লাহ তাঁর ছোট বোন।

নায়ক রুবেল এমন একজন নায়ক, যিনি কখনো অ্যাকশন দৃশ্যে ডামি ব্যবহার করতেন না। একবার ‘দিনমজুর’ ছবিতে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন। প্রায় দুই  যুগ এই নায়কের কোনো ছবি ফ্লপ নেই! যে ছবি কম চলেছে তাও পুঁজি ফেরৎ পেয়েছে। নায়ক রুবেলের ছবি বর্ষসেরা হয়েছে কয়েকবার | ১৯৮৬ সালে ‘লড়াকু’ ১৯৮৮ সালে ‘বীরপুরুষ’  ১৯৯০ সালে ‘বিপ্লব’ ২০০১ সালে মাসুম পারভেজ রুবেল পরিচালিত  ‘বিচ্ছু বাহিনী’ অন্যতম। ‘বিচ্ছু বাহিনী’ ছবিটি নব্বইয়ের দশকের বেশ কিছু ব্যবসা সফল ছবির রেকর্ড ভঙ্গ করে বেশি আয় করে। ‘লড়াকু’ ছবিতে যে মারপিটের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে, তা এই দেশের সিনেমায় শুধু নয় উপমহাদেশের কোনো সিনেমায় ছিল না। প্রযোজক মাসুদ পারভেজ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, লড়াকু ছবিতে নতুন  নায়ক রুবেল মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে যে সব দৃশ্যে অভিনয় করেছেন তা যদি উপমহাদেশের অন্য কোনো নায়ক করতে পারে তবে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে!!  এর ফলাফল আমরা পেয়েছি মুভিটি মুক্তি পেলেই। লড়াকু বাংলাদেশের সিনেমায় এক নতুন ধারার সংযোজন। শুধু অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য নয় বরং আমরা পেয়েছি এক নতুন নায়ক রুবেলকে; আরো পাই মার্শালআর্ট জানা ভিলেন ড্যানি সিডাক, নতুন নায়িকা পাপড়ি। পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন তাঁর মেধাকে  লড়াকু ছবিতে ভালোভাবেই ব্যবহার করেছেন এবং তার ফলাফলও পেয়েছেন। সেই সময়ে রুবেলের জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে মানুষের ছেলে বাচ্চা হলেও তার নাম রুবেল রাখত। নায়ক রুবেলের নামে নির্মাণ করা হয় সিনেমা  ‘রুবেল আমার নাম’ । এছাড়াও ‘ডন’ ‘সুখের আগুন’  ‘মায়ের কান্না’  ‘লৌহ মানব’  ‘আজাদ’ ‘আমি শাহেনশাহ’  ‘ভন্ড’ ‘চারদিকে অন্ধকার’ ‘টর্নেডো কামাল’  ‘বজ্রপাত’ ‘বীরযোদ্ধা’ সহ আরো অনেক ছবিই ব্যবসা করে সুপার-ডুপার হিট। দেশের শীর্ষ থাকা এই নায়ক শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৯৮ সালে তাঁর প্রযোজিত নীলা ফিল্মস পরিবেশিত প্রথম ছবি বাঘের থাবা পরিচালনা করেন তাঁর বড় ভাই মাসুদ পারভেজ । এই ছবিতে বাংলাদেশে প্রথম উপিং কুংফু দেখানো হয়। এছাড়া ডান্সিং কুংফু, আর্থ কুংফু, ড্রাঙ্কেন কুংফুসহ কুংফু-কারাটির নিত্য-নতুন কৌশল নায়ক রুবেল দর্শকদের উপহার দেন। দর্শকরাও এইসব দৃশ্যের সিনেমায় দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত। মাসুম পারভেজ রুবেল ‘বিচ্ছু বাহিনী’ ‘মায়ের জন্য যুদ্ধ’  ‘প্রবেশ নিষেধ’ ‘অন্ধকারে চিতা’  ‘খুনের পরিনাম’ ‘বাঘে বাঘে লড়াই’ ‘টর্নেডো কামাল’ ‘বিষাক্ত চোখ’ ‘রক্ত পিপাসা’ ‘সিটি রংবাজ’ ‘চারিদিকে অন্ধকার’ ছবিগুলো পরিচালনাও করেন। সব কটি ছবিই সুপারহিট ব্যবসা করে। নায়ক সোহেল রানা, আলেকজান্ডার বো, ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলমসহ আরো দুই একজন নায়কও ছবিতে মার্শালআর্ট দৃশ্য ব্যবহার  করেছেন। কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে অ্যাকশন কিং হিরো রুবেলের মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমাগুলো বেশি জনপ্রিয় হয়। এজন্য বোধ করি রুবেলকে বলা হয় মার্শাল আর্টের জীবন্ত কিংবদন্তি। নায়ক রুবেলের ‘বিষদাঁত’ ছবি দেখে মার্শালআর্ট চর্চা করতে গিয়ে সেই সময় নাটোরের গুরুদাসপুরে দুই বন্ধুর মধ্যে একজনের মৃত্যু ঘটে। বিষয়টি পাঠককে নাড়া দেবে জানি। কিন্তু এটা সত্য যে নায়ক রুবেলের সিনেমায় আসার পর তরুণদের মার্শাল আর্ট শেখার প্রবণতা বহুগুনে বেড়ে যায়। মার্শালআর্ট নিয়ে বাংলাদেশের মত উপমহাদেশের আর কোনো দেশে এত সংখ্যক ছবি নির্মিত হয়েছে কি? নায়ক রুবেল মাত্র বাইশ বছর বয়সে পরপর দুইবার যথাক্রমে ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

অবশ্য নায়ক রুবেল নায়ক হবার পূর্বেও সিনেমায় কাজ করতেন! বড় ভাই মাসুদ পারভেজের সহকারী পরিচালক হিসেবে। রুবেল প্রথম কাজ করেন মাসুদ পারভেজের ‘জীবন নৌকা’ ছবিতে। মাসুদ পারভেজ প্রযোজিত শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘রক্তের বন্দী’ ছবিতে মাসুম পারভেজ রুবেল প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর ‘শরীফ বদমাশ’  ‘হাইজ্যাক’  ছবিতেও রুবেল কাজ করেন। আলম খানের সুরে ‘জীবন নৌকা’ ছবিতে রুবেল প্রথম প্লেব্যাক করেন। তাঁর গাওয়া রক ধাঁচের গানটি (মেঘ যদি সড়ে যায় ………..) সেই সময় জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়া নায়ক রুবেল ‘মহাতান্ডব’ ছবিতেও প্লেব্যাক করেন। নায়ক রুবেলের অনন্য সৃষ্টি ‘দি অ্যাকশন ওয়ারিয়র্স’ । এই ফাইটিং গ্রূপটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অ্যাকশন দৃশ্যের ধারণাই পাল্টে দেয়। অবশ্যই আমরা বলতে পারি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ফাইট ডিরেক্টর নায়ক রুবেল। নায়ক রুবেল ‘যোদ্ধা’ ও  ‘বিচ্ছু বাহিনী’ ছবিতে অভিনয় করার জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার লাভ করেন।বড় ভাই মাসুদ পারভেজ বাবলু একজন তুখোড় ছাত্রনেতা এবং সম্মুখ সমরে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তত্কালীন ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সাবেক ভিপি মাসুদ পারভেজ এক ধরণের আবেগ আর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বন্ধুদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ‘ওরা এগার জন’ । ছবিটি প্রশংসা পেয়েছে অনেক, এযাবৎ মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত সর্বকালের সেরা ছবি ‘ওরা এগার জন’ । এরপর আগ্রহ থেকেই নির্মাণ করতে উদ্যত হন কাজী আনোয়ার হোসেন এর বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্র মাসুদ রানা সিরিজের বিস্মরণ  গল্প অবলম্বনে ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্র। কিন্তু নায়ক সংকটে সুমিতা দেবী আর আহমেদ জামান চৌধুরীর পরামর্শে নিজেই নায়ক হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন! ‘মাসুদ রানা’ ছবিতে আমরা পেলাম পরিচালক মাসুদ পারভেজ এবং নায়ক

সোহেল রানাকে। মাসুদ পারভেজ হয়ে গেলেন সোহেল রানা! মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তাঁর ছোট ভাই কামাল পারভেজ আসেন সিনেমা প্রযোজনায়। আবার নায়ক রুবেলও আসেন নায়ক হয়ে। নায়ক রুবেল নায়ক হয়ে এসে আবার বড় ভাইয়ের মত হয়ে ওঠেন সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালক। নায়ক সোহেল রানা, নায়ক রুবেল, অভিনেতা ও প্রযোজক কামাল পারভেজ সবাই সফল। প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে মাসুদ পারভেজ ছিলেন অনন্য। মাসুদ পারভেজ ছিলেন নতুনদের চলচ্চিত্রে আনার জন্য মহীরুহ। সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমানকে মাসুদ পারভেজ গায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেন। চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী, কলাকুশলী, নির্মাতা তৈরিতে তাঁর কীর্তি চিরস্মরণীয়। বাংলাদেশী সিনেমায় নায়ক হিসেবে ড্যাশিং হিরো সোহেল রানাকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। সত্তরের দশকের মাঝ থেকে আশির দশক পর্যন্ত তিনি সুপারস্টার ইমেজে ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার মূল্যায়নও দর্শক করেছেন, তিনি দর্শকদের অগণিত সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন। ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা প্রায় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে তিনি তিনবার (কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘লালু ভুলু’  দিলীপ বিশ্বাসের ’অজান্তে’ মুহাম্মদ হান্নানের ‘সাহসী মানুষ চাই’  জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার(অভিনয়ে) লাভ করেন। পারভেজ ফিল্মসের কর্ণধার প্রযোজক ও পরিচালক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) ছিলেন অনন্য রুচির। প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক এই সভাপতি সবসময় বৈচিত্রময় কাজ করতে পছন্দ করতেন, হোক তা অভিনয়ে, গানে, ফাইটিংয়ে, গল্পে অথবা শিল্পী নির্বাচনে। ঢাকাই বাণিজ্যিক ধারার অনিন্দ্য কিছু সিনেমা উপহার দিয়েছেন। মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা এতটাই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রকার যে, সিনেমার পোস্টারে মাসুদ পারভেজ অথবা সোহেল রানা এই দুটি নামের যে কোনো একটি থাকলেই সেই ছবি দেখতে দর্শক সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়তো। তাঁর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে পরিচালক খসরু নোমান নির্মাণ করেন ‘সোহেল রানা’ মুভিটি। বাংলাদেশে নায়কের নামে এই প্রথম সিনেমা। ‘মাসুদ রানা’ ‘এপার ওপার’  ‘জীবন নৌকা’ ‘নাগপূর্ণিমা’,’যাদুনগর’ ’মড়কসা’ ‘ঘেরাও’ ’শত্রু সাবধান’ ’ভালোবাসার মূল্য কত’ ’রিটার্ন টিকেট’ তাঁর প্রযোজিত-পরিচালিত অন্যতম সফল সিনেমাগুলো। এছাড়াও ‘ওরা এগার জন, ‘দস্যু বনহুর’ ‘লড়াকু’ ’বজ্রমুষ্টি’ ‘চোখের পানি ‘ঘরের শত্রু’  ‘গৃহ যুদ্ধ’  ‘অন্ধকারে চিতা’  ‘ ‘মায়ের জন্য পাগল’   ‘অন্ধকার চারদিকে’  ‘ডালভাত’ তাঁর প্রযোজিত সিনেমা। আবার, ‘শরীফ বদমাশ’ ‘বাঘের থাবা’ এই ছবি দুটি নিজের প্রযোজিত না হলেও তিনিই পরিচালনা করেছেন। এই সিনেমাগুলির একটি অন্যটির চেয়ে আলাদা ঘরানার। ২০১৩ সালে মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা তার একমাত্র পুত্র মাশরুর পারভেজ জিবরানকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘অদৃশ্য শত্রু’ ছবিটি। অভিনেতা পুত্রের পরিচালনায় নায়ক পিতার সিনেমায় অভিনয় এই প্রথমবার। উল্লেখ্য, কামাল পারভেজের ছেলে আকিব পারভেজ ’অদৃশ্য শত্রু’ ছবিটি মাশরুর পারভেজের সাথে যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন। তত্কালীন পূর্ব-পাকিস্থান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বরেণ্য অভিনেতা, নির্মাতা ও প্রযোজক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা ২০১৯ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে আজীবন সম্মাননা পাবার পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা নায়ককে অভিবাদন জানাই। ১৯৭১ সালে `ওরা এগার জন’  থেকে শুরু করে ২০২১ সাল; প্রযোজক মাসুদ পারভেজ-নায়ক সোহেল রানার ঢালিউডে পঞ্চাশ বছর ছুঁই ছুঁই। আমাদের চলচ্চিত্রের সাথে তিনি রয়েছেন প্রায় অর্ধশত বছর ধরে।তাঁদের আরেক ভাই কামাল পারভেজ ঢাকাই সিনেমার সফল প্রযোজকদের মধ্যে অন্যতম। কামাল পারভেজ প্রযোজিত প্রথম সিনেমা ‘শরীফ বদমাশ’ কামাল পারভেজ প্রযোজিত শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘বীরপুরুষ’  ১৯৮৮ সালে শুধু বর্ষসেরা ছবিই নয় বরং সেই সময় বেশ কয়েক বছর সিনেমার ব্যবসার রেকর্ড ব্রেক করে।

এছাড়াও কামাল পারভেজ প্রযোজিত ‘হাইজ্যাক’ ‘আমি শাহেনশাহ’ ‘শত্রু ভয়ঙ্কর’ ‘টপ রংবাজ’ ‘বিশ্বপ্রেমিক’’ খুনের পরিণাম’ সহ আরো চলচ্চিত্র হিট-সুপারহিটের তালিকায় রয়েছে। কামাল পারভেজ জনপ্রিয় অভিনেতা না হলেও মাসুদ পারভেজ ক্ল্যাসিক সিনেমা ‘জীবন নৌকা’  ছবিতে অভিনয় দিয়ে অনেক প্রশংসা পেয়েছেন। নায়ক সোহেল রানা ও সুচরিতার সাথে এই ছবিতে কামাল পারভেজের অভিনয় ছিল নজরকাড়া। তিনি প্রযোজক হিসেবে চলচ্চিত্রে আসার পূর্বেই অভিনেতা হয়েছেন।‘জীবন নৌকা’র পরে তিনি আর অভিনয় করেননি। তবে ’বীর পুরুষ’  ছবিতে দর্শকরা কামাল পারভেজকে আবারো পেয়েছিল। ব্লকবাস্টার মুভি ‘বীরপুরুষ’ ছবিতে ঢালিউডে প্রথমবারের মতো তিন ভাইয়ের (সোহেল রানা, রুবেল, কামাল পারভেজ) পর্দায় উপস্থিতি ছিল।

এছাড়াও এই মুভিতে বীরপুরুষ সোহেল রানাকে পরামর্শ দানকারী হিসেবে অভিনয় করেন কামাল পারভেজ। ঠিক যেমনটি মাসুদ রানাকে তথ্য ও পরামর্শ দেন মেজর রাহাত। এখানে গল্পের প্রয়োজনে সোহেল রানাকে যদি মাসুদ রানা ধরি তবে নিশ্চিৎ বলতে পারি কামাল পারভেজ মেজর রাহাতের ভূমিকায় ছিলেন। মজার বিষয় হলো এই তিন ভাইকেও আর কখনো এক সাথে এক সিনেমায় অভিনয় করতে দেখা যায়নি। তবে কামাল পারভেজ প্রযোজিত শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘বিশ্বপ্রেমিক, ‘শত্রু ভয়ঙ্কর, ‘টপ রংবাজ’ ছবিতে সোহেল রানা ও রুবেল একত্রে

অভিনয় করেছেন। আর কামাল পারভেজ অভিনয় প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও জায়গা করে নেন সিনেমায় পর্দার পেছনের কারিগর হিসেবে। কামাল পারভেজের ছেলে আকিব পারভেজ চলচ্চিত্র পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছেন। কামাল পারভেজ রুচিশীল প্রযোজক ছিলেন। ‘বিশ্বপ্রেমিক’ ছবির নান্দনিকতা দেখলেই বোঝা যায়। তাঁর সিনেমাগুলি ছিল অ্যাকশন নির্ভর। বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রের ক্রান্তিকালে কামাল পারভেজের মতো প্রযোজকের প্রয়োজন। ঢাকাই ছবির তিন পারভেজ ভ্রাতার মিথস্ক্রিয়ায় দর্শক পেয়েছে বাণিজ্যিক ধারার সুস্থ ছবি। তাঁরা তিন ভাই একসাথে অথবা আলাদাভাবে চেষ্টা করেছেন দর্শকদের চাহিদা পূরণ করতে। যতদিন দেশীয় চলচ্চিত্র থাকবে ততদিন তাঁদের নাম এবং বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তাঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর পারভেজ ভ্রাতাত্রয়ী থাকবেন সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের হৃদয়ের মনিকোঠায়।

লেখকঃ গল্পকার ও কবি।

fattahtanvir@gmail.com

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে