দফায় দফায় ছুটিতে শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা

0
28

নিজস্ব প্রতিবেদন: দেদারসে সরকারি-বেসরকারি, ডান-বাম দলের সভা-সমাবেশ হচ্ছে; মানববন্ধন, মাজার জিয়ারত, জানাজা, কুলখানিও হচ্ছে মহাসমারোহে। স্থগিত উপনির্বাচন কিংবা আসন্ন ইউপি নির্বাচনের প্রচারণাও চলছে বেশ জোরেশোরেই। বাজার থেকে বিপণী বিতান,রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, পোশাকশিল্প থেকে পর্যটনশিল্প, গণভবন থেকে গণপরিবহন, সিনেমাপাড়া থেকে পতিতাপাড়ায়ও চিরচেনা চিত্র; শুধু চিরচেনা চিত্রে ফিরতে পারছেনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! এখানেই কেবল মঞ্চায়িত হচ্ছে বিধিনিষেধ নামক ধারাবাহিক নাটক কিংবা রম্য যাত্রাপালা।

কিছুদিন আগে তোরজোর দিয়ে বলা হলো সারাদেশে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হবে এবং সপ্তাহে কমপক্ষে ৬৬ লক্ষ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে আর প্রতি মাসে ২ কোটির অধিক মানুষ টিকা পাবে। দিন দুয়েক টিকা কার্যক্রম চললো কিন্তু এরপর আর গণটিকার হদিস নাই! স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো টিকা সংকট, তাই আপাতত গণটিকা কার্যক্রম বন্ধ। এই মর্মে একটা কথা কেন যেন বারবার মনে পড়ছে, প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় দেখি সংবাদকর্মীদের ছবি তোলা শেষে সংকটের দোহাই দিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এটি যেন তারই অনুরূপ!
অবশ্য আগে থেকেই একটু দ্বিধা ছিলো এইযে ওরা সপ্তাহে ৬৬ লক্ষ মানুষকে টিকার আওতায় আনবে বলে গলা ফাটাচ্ছে কিন্তু সপ্তাহে টিকার চালান আসে মাত্র ১/২ বার (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একবার) তাও ১০ থেকে ২০ লাখের বেশি না। এর মধ্যে কয়েকবার এসেছে চীনের উপহার সিনোফার্ম, কোভেক্সের আওতায় জাপানের অ্যাস্ট্রজেনেকা আর কিছু মর্ডানার টিকা যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই অপ্রতুল টিকায় কিভাবে সপ্তাহে ৬৬ লক্ষ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে! যদি গণটিকা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হয় তা-ও সরকারের টার্গেট অনুযায়ী ১৩ কোটি মানুষকে ২৬ কোটি ডোজ টিকা দিতে সময় লেগে যাবে প্রায় ৭ মাস। এদিকে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেবান গত ২৮ জুলাই বলেছেন, “টিকা কার্যক্রম শেষ হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। ” এবার হিসাব কষে দেখুন তো এরকম কচ্ছপ গতিতে টিকা কার্যক্রম চললে ঠিক কতো বছর পর এই মহান কার্যক্রম সম্পন্ন হবে আর ঠিক কবে নাগাদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে!

চীনের সাথে চার দফায় ৭ কোটি টিকা কেনার চুক্তি করলো সরকার কিন্তু অধিকাংশ সময়ই চালান আসে ১০ থেকে ২০ লাখের মধ্যে। এমন ছোট ছোট চালানে কবে নাগাদ সাত কোটি টিকা এসে পৌছবে?
কিছুদিন আগে চীনের সিনোফার্মের ফর্মুলায় দেশেই টিকা উৎপাদনের চুক্তি করলো সরকার তবে টিকা উৎপাদনে যাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।এদিকে দেখা যাচ্ছে লকডাউন শিথিল করার পর থেকে যারপরনাই টিকার চালানে নেমে এসেছে স্থবিরতা। তবে জনজীবন স্বাভাবিক হয়েছে_ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য,জনগণও আগের মতোই দেদারসে মাস্কবিহীন ঘোরাফেরা করছে, সুতরাং এমন বেপরোয়া জীবনযাপনে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা বাড়বে এদিকে সরকারও আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ‘প্রয়োজনে আবারও কঠোর লকডাউনে যাওয়ার! ‘ অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন সংক্রমণ ৫% এর নিচে না নামলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবেনা। এমন বেপরোয়া চলাচলে সংক্রমণও আর কমছেনা আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও খুলছেনা এইতো ?

গতবছর করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, প্রয়োজনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ২০২০ এর সেপ্টেম্বর শেষে আজ দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২১ এর সেপ্টেম্বর অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে না উল্টো শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে আসছে ধারাবাহিক ছুটির ঘোষণা।

আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। একদিকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের দোর্দণ্ড প্রতাপ অন্যদিকে করোনার চোখ রাঙানি ও দফায়-দফায় লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে মাসের পর মাস অন্ধকার এক শঙ্খনীল কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করতে হচ্ছে মানুষকে। কিন্তু পেট পূজা না করলে যে ক্ষুধা নামক ভগবান রুষ্ট হন,অচল করে দেন দেহঘড়ির একেকটা অঙ্গ-প্রতঙ্গ! একদিকে অদৃশ্য ভাইরাসের ভয় আরেকদিকে বিশ্ববাজারের টালমাটাল পরিস্থিতিতে দাম বাড়ছে মৌলিক চাহিদার সবরকম উপাদান। এহেন পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই যেখানে চরম সার্থকতা সেখানে শিক্ষার মতো অমূল্য দ্যুতিও ফিঁকে হয়ে যায়। বাংলাদেশে এখনো শিক্ষার হার ৬০-৬৫ % যা একুশ শতকের পৃথিবীর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এভাবে মাসের পর মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অসচ্ছল-নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বই-খাতা সিঁকেয় তুলে খাদ্যের অন্বেষণে পথে নামতে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এদের মধ্য থেকে কতজন পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। যদি এর কিয়দাংশও না ফেরে তাহলে আবারও শিক্ষার হার নিম্নমুখী হবে,দেশ পিছিয়ে যাবে এক যুগেরও বেশি!

দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে সামাজিক অপরাধ। তরুণদের মধ্যে বেড়েছে হতাশা,ভেঙে পড়েছে সম্ভাবনাময় তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিনিয়ত যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ, নারীপাচার, হত্যা, ছিনতাই,আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, কিশোরগ্যাং এর মতো সামাজিক অপরাধগুলো বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মারাত্মকভাবে জড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর মাদকাসক্তিসহ নানাবিধ অপরাধে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই সামাজিক অপরাধের ছড়াছড়ি।এর নেপথ্যে অনেকটাই দায়ী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে যোজন-যোজন দূরত্ব। অনলাইন ক্লাসের নামে শিক্ষার্থীরা মেতে উঠেছে ফ্রী-ফায়ার,পাব্জিসহ নানান ক্ষতিকর অনলাইন গেমস,পর্নোগ্রাফি, টিকটক নিয়ে। এগুলো এতোটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত এটি গড়িয়েছে এবং ক্ষতিকারক গেমসগুলো বন্ধ করতে নির্দেশ দিতে হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে!

শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা বাঙালির মেরুদণ্ডকে শক্ত করতে সরকার, বিভিন্ন এনজিও,ইউনিসেফ স্বাধীনতার পর থেকে নানাবিধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন কিন্তু গত ১৭ মাসে শিক্ষার আলো থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের এক কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে পড়েছে আগামী দিনের অভিযাত্রীরা। এই অসীম অমানিশার অতলান্তিকে আগামীর অগ্রপথিকদের ঠেলে দিচ্ছে একটা কুচক্রী মহলের ঘৃণ্য রাজনীতি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে