‘নয় মাস মা রোজা রেখেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য’

বিশেষ সাক্ষাৎকার

0
155

বিজয়ের মাসে আমাদের পদ্মা সেতুর শেষ অর্থাৎ ৪১তম স্প্যান বসানো হয়ে গিয়েছে। জাতি আজ উল্লসিত। একই সঙ্গে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করতে যাচ্ছি। এই বছর আমাদের জাতির জনকের জন্ম শতবর্ষ চলছে, আমরা সেটা মুজিব বর্ষ হিসেবে উদযাপন করছি। এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক সূচক, মানবিক উন্নয়ন সূচক সব কিছুতেই পাকিস্তানের থেকে আমরা অনেক বেশি এগিয়ে আছি। এই বাংলাদেশ যাদের অবদানে এসেছে তাদের মধ্যে একজন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম শিশির। তিনি নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানার খুবজিপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত সরদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল কলেজে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখান থেকে দেশে চলে আসেন। পরে ভারতের পশ্চিমবাংলার বাঙালিপুর ক্যাম্প এবং দেরাদুনের চাকারাথা ক্যাম্পে ট্রেনিং কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। আগস্ট মাস হতে নওগাঁ এবং বগুড়া জেলার সীমান্তে গেরিলা অপারেশনের জন্য কমান্ডিং অফিসার হিসেবে মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ করেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা চলে যান। বিশেষ এই সাক্ষাৎকারে আজ আমরা কথা বলবো চলনবিলের এই কৃতিসন্তানের সাথে। চলনবিল প্রবাহের পক্ষ থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি এস এম মহিউদ্দিন।

চলনবিল প্রবাহ: যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন সেই দেশের অর্জনগুলোর খবর শুনলে কেমন লাগে?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আলহামদুলিল্লাহ। সর্বপ্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্য যারা জীবন দিয়েছেন, জাতীয় চার নেতা যারা শহীদ হয়েছেন এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য যে ৩০লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, তাদের সবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আসলে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম দেশের এরকম খুশির খবর শুনব বলেই। যুদ্ধ যারা করেছে কিংবা যুদ্ধের জন্য যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে সেখানে আমাদের একটা জিনিস শেখানো হয়েছিল; সেটা ইংরেজিতে বলা হয়, “ইজ নট দ্যাট উইপন দ্যাট ফাইটস, ইজ দ্য ম্যান বিহাইনড দ্যা উইপন এন্ড দ্যা কজ বিহাইন্ড দ্যা ম্যান দাট ফাইটস”। আসলে- অস্ত্র কখনো যুদ্ধ করে না অস্ত্রের পেছনে যে মানুষটা রয়েছে এবং তার ভেতরে যে উদ্দীপনা রয়েছে সেটাই হল যুদ্ধের মূল হাতিয়ার। বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই ভাবে তৈরি করেছিলেন, যে কারণে আমরা দেশের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। কিছু দালাল এবং পাকিস্তানীদের সহযোগী ছাড়া, সাড়ে সাত কোটি মানুষ সবাই জান দিতে তৈরি ছিল।  বঙ্গবন্ধু জানতেন বাঙালি জাতির কতটা সম্ভাবনা আছে। এটা ব্রিটিশরাও জানতো। যার জন্য বোথেল বলেছিলেন, হোয়াট বেঙ্গল ক্যান থিংক টুডে, অল ইন্ডিয়া ক্যান থিংক টুমোরো। সেটারই প্রতিফলন আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যার কারণে পাকিস্তানি শাসকরা বলছেন হায়, আমরা যদি বাংলাদেশের মতো হতে পারতাম। এবং সেটাই প্রমাণ করে এই জাতিকে কি করতে পারে। সমস্ত বিশ্বকে তোয়াক্কা না করে, এবং বিভিন্ন চক্রান্তকে উপেক্ষা করে আজকে আমরা পদ্মা সেতু তৈরি করলাম। শুধু তাই না, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এত মেগা প্রজেক্ট চলছে যেগুলো সম্পন্ন হলে, ইনশাআল্লাহ একদিন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। হেনরি কিসিঞ্জার এখনো বেঁচে আছে। সে বলেছিল, বাংলাদেশ বটমলেস বাস্কেট! তলাছাড়া একটা ঝুড়ি। সেই হেনরি কিসিঞ্জারের আজকে লজ্জা হওয়া উচিত, মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারলো বাঙালিরা কি করতে পারে।

চলনবিল প্রবাহ: মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আপনি লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখান থেকে কিভাবে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমি ১৯৬৯ সালে বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তানের কি এডওয়ার্ড মেডিকেল কলেজ যেটা লাহোরে সেখানে পড়তে যাই। এরপর ৬৯এর গণ আন্দোলন হল, দেশে ঘূর্ণিঝড় আসলো, সত্তরের নির্বাচন হলো সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে যা ঘটেছিল; আমাদের উপর অত্যাচার, ক্ষমতা দিতে অস্বীকার, এসবের কারণে আমাদের ভেতর দেশাত্মবোধ অনুপ্রেরণা তৈরি হয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তানিরা আমাকে ধরে নিয়ে নানা ভাবে অপমান করে, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে আমরা দেশে আসার জন্য এয়ারপোর্টে আসলাম। কিন্তু সেখানে এসে শোনা গেল ঢাকা এয়ারপোর্টে যারা নামছে তাদেরকে জবাই করা হচ্ছে। শুনে আমার সাথীরা আসতে অস্বীকৃতি জানালেন। তথাপি আমি পাকিস্তানি আর্মিদের সাথেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় আসি। এবং তিন দিন ধরে পায়ে হেটে গ্রামের বাড়িতে যাই। এবং সেখান থেকে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং অংশগ্রহণ করি।

চলনবিল প্রবাহ: এই যে আপনি গ্রামে থেকে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন আপনার পরিবার আপনাকে কিভাবে এমন পরিস্থিতিতে বিদায় দিল?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: গ্রামে যাওয়ার পরে আমি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরেছি আমি ইন্ডিয়াতে যাব। ছাত্র অবস্থাতে আমার আর্মি ট্রেনিং নেয়া ছিল সেই ট্রেনিংকে পুঁজি করে আমি ইন্ডিয়াতে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নেতারা যেতে রাজি হলেন না। যার জন্য আমার দুই বন্ধু মরহুম আব্দুল জলিল ও মরহুম ইউনুসকে সাথে নিয়ে ভারতের পথে রওনা দিতে হয়েছিল। ইন্ডিয়াতে যাওয়ার জন্য আমাকে অনেক গোপণীয়তা রক্ষা করে চলতে হয়েছে। শুধু মাকে বলেছিলাম মা, তুমি পেটে ধরেছো কিন্তু যে ভূমিতে আমি জন্মগ্রহণ করেছি সেই মাকে স্বাধীন করার জন্য আমি যাচ্ছি। মা তার কাছে যে টাকা পয়সা ছিল সব আমাকে দিয়ে বলল, হ্যাঁ ব্যাটা তুই চলে যা। নয় মাস, মা রোজা রেখেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, আমাদের জীবনের জন্য। সেই মায়ের প্রেরণায় ছিল আমার জন্য বড় প্রেরণা। মা আমাদেরকে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আমি সবসময় সেই দোয়া পড়তাম এবং সেই দোয়ার ফজিলত আমাদেরকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেছে।

চলনবিল প্রবাহ: আপনারা তো সংগঠিত ছিলেন না, সেক্ষেত্রে কেমন করে সীমান্ত পার হলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমি প্রথমে আমার দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে বর্ডার পার হওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু সাতমাইল যাওয়ার পরে ওরা দুজন কান্না শুরু করল; আমরা কোনদিন যুদ্ধ করিনি, আমরা বাড়ি ফিরে যাব। ফলে ওদের নিয়ে ফেরত আসতে হয় এবং এরপর থেকে আমি ওদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। একদিন আমার দুলাভাই বলল সে ব্যবসার কাজে নওগাঁর পত্নীতলায় যাবে নৌকা নিয়ে, আমি দুলাভাইয়ের সাথে সেই নৌকায় মাঝি হয়ে যোগ দিলাম। রাস্তায় নৌকার গুন টানতে টানতে যাচ্ছিলাম। বিলদহর এর কাছে এসে দেখি আমার দুই বন্ধু দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। আব্দুল জলিল এবং ইউনুস এসে আমাকে বলল যে আমাদের উপর রাগ করিস না, আমরা এবার সত্যি সত্যিই তোর সাথে যুদ্ধে যাবো। তখন ওদের সহ আমরা বর্ডার পার হতে চেষ্টা করি কিন্তু পাকিস্তান আর্মি আসা তে আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আবার রাতের অন্ধকারের মধ্যেই আমরা সবাইকে খুঁজে বের করে সকাল হবার আগেই বর্ডার পার হয়ে ভারতে চলে গিয়েছিলাম। ভারতে গিয়ে আমরা প্রথমে মরহুম আব্দুল জলিল ভাই, যিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তাঁর ক্যাম্পে যাই। সেখানে প্রথমে আমাদেরকে নেয়া হয়নি। আমরা পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে গিয়েছিলাম এবং আমাদের মুখে দাড়ি ছিল। কিন্তু আব্দুল জলিল ভাইয়ের আব্বা, আমার আব্বার সাথে পাটের ব্যবসা করতেন, তিনি যখন আমার পরিচয় জানলেন, তিনি তখন আব্দুল জলিল ভাইয়ের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং আমার আব্বার পরিচয় দিয়ে বললেন, এরা খুবই ভালো পরিবার। আমি জলিল ভাইকে বললাম, আমি পাবনা জেলা স্কুলের বয় স্কাউটএর লিডার ছিলাম, আমার মিলিটারি ট্রেনিং আছে। এগুলো জানার পরে জলিল ভাই আমাকে ওই ক্যাম্পের ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্ব দিলেন। কারণ আমার মত ট্রেনিং আর কারো ছিল না। সেইদিন থেকে আরো তিন মাস আমি পশ্চিম দিনাজপুরের বাংগালীপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি।

চলনবিল প্রবাহ: সেখানে আপনি কতজন মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছিলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আসলে ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা আসত, ট্রেনিং নিয়ে আবার তারা চলে যেত। তাই সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল। তবে আমার তিন মাসে আমি কমপক্ষে এক হাজারেরও বেশি মুক্তিযুদ্ধাকে ট্রেনিং করিয়েছি।

চলনবিল প্রবাহ: তিন মাস ট্রেনিং দেয়া শেষে তারপর আপনি কি করলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: ট্রেনিং প্রশিক্ষক হিসেবে তিন মাস পার হওয়ার এক পর্যায়ে, ভারতের দুজন হাই অফিশিয়াল আসলেন। আমাকে বললেন আপনাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন বুদ্ধিমান এবং খুব পরিশ্রম করতে পারবে এরকম ছেলে দেন এবং আপনিও আমাদের সাথে চলেন। সেখানে আমি ১০ জন ছেলে দিলাম, যাদের মধ্যে আমি ছিলাম, জলিল ছিল, ইউনুস ছিল এবং মোফাজ্জল ভাই ছিলেন যার বাড়িতে আমি পুরো মুক্তিযুদ্ধের আগস্ট মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ছিলাম। দশ কিংবা বারো মাইল যাওয়ার পরে তারা আমাদেরকে বললেন, তোমাদেরকে একটা বিশেষ ট্রেনিং দিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কোন প্রশ্ন করতে পারবে না। তবে যদি ভয় পাও, তোমরা ফেরত যেতে পারো। আমরা সবাই বললাম, না আমরা ভয় পাই না, আমরা ট্রেনিং নিতে চাই। তারপর আমাদের ইন্ডিয়ান আর্মির একটা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হল। অনেক রাতে আমাদেরকে শিলিগুড়ির একটা এয়ারফোর্স বেস এর ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। পরদিন সেখানে মরহুম আব্দুর রাজ্জাক ভাই, তোফায়েল আহমেদ ভাই এবং সিরাজুল আলম খান ভাই এসে আমাদেরকে বললেন, তোমাদেরকে এক বিশেষ ট্রেনিং দিতে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা পাহাড়ের ওপরে ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে, তোমরা যদি কেউ না যেতে চাও এখনি বল অথবা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। আমরা বললাম, আমরা প্রস্তুত। আমাদের সবাইকে একটা হিন্দু নাম নিতে হয়েছিল, আমার নাম হয়েছিল শিশির ভাদুড়ী। সেই থেকে আমি আমার নামের সাথে শিশির নাম যুক্ত করে রেখেছি। আমরা প্রথমে পাঞ্জাবের লুধিয়ানাতে গেলাম সেখান থেকে দেরাদুনের ‘চাখারাতা আর্মি ক্যান্টনমেন্টে’ এসে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করলাম। আমরা ছিলাম তৃতীয় ব্যাচ। আ ফ ম মাহবুবুল হক, সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ভাই ওনারা ছিলেন দ্বিতীয় ব্যাচ। ওখানে আমাদের খুব পড়াশোনা করতে হত, গেরিলাযুদ্ধের উপরে পরীক্ষা দিতে হত। সেখানে মাহবুব ভাইয়ের স্কোর হল-৩০ এবং আমার স্কোর হল সর্বোচ্চ ৩১। সর্বোচ্চ স্কোর করার কারণে আমাকে ক্যাম্পের ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। ট্রেনিং শেষে আব্দুল জলিল, ইউনুস এবং মোফাজ্জল ভাই দেশের পথে রওনা হয়ে গেল কিন্তু পথে বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ওরা আবার রাতে ফেরত আসলো। ফিরে এসে আমাদের ক্যাম্প কমান্ডার কর্নেল মালহোত্রার কাছে গিয়ে এরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করল, আমাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কর্নেল মালহোত্রা আমাকে এসে বললেন, এরা তো তোমাকে ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ করতেই পারবে না। তাছাড়া তোমার মা এদের দেখলে, আর তোমাকে না দেখলে ভাববে তুমি মারা গেছো। তাই তিনি আমাকে ওদের সাথে যাওয়ার জন্য রিলিজ করে দিলেন। সেখান থেকে শিলিগুড়ি বর্ডারে আসলাম এবং বিশেষ পদ্ধতিতে অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে আগস্ট মাসে আমরা দেশের ভেতরে প্রবেশ করলাম।

চলনবিল প্রবাহ: আপনারা দেশের ভেতরে এসে কি ধরনের গোপনীয়তা বজায় রাখতেন এবং কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করতেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমরা দেশের ভেতরে এসে মোফাজ্জল ভাইয়ের এলাকা নারান পাড়া, গুয়াতা, আবাদপুকুর অঞ্চলে আসলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি ছিলেন, আহমদ চাচা, আমি মনে করি আমাদের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান বেশি। উনার বাড়িতে আমরা পাঁচটা মাস থেকেছি। ঘরের চালার নিচে আমরা সারাদিন থাকতাম, রাতে বের হতাম। সেখানে আমাদের পেশাব-পায়খানার ব্যবস্থা করেছেন, প্রতিদিন চাচি আমাদের রান্না করে খাইয়েছেন। সেই চাচা আমাদেরকে জান-প্রাণ দিয়ে সেবা করে গেছেন। আমাদের গোপন লোক ছিল, তারা দিনের বেলায় ছাত্র ও সক্ষম লোক সংগ্রহ করে রাখতেন। আমরা রাত এগারোটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতাম। এভাবে ট্রেনিং করাতে করাতে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি চৌদ্দশত গেরিলা ট্রেনিং করিয়ে তৈরি করেছিলাম। এবং তারা যুদ্ধ করেছে। এখানে একটা কথা অবশ্যই আমার বলা প্রয়োজন, যারা যুদ্ধ করেনি তারা তারা যুদ্ধের ইতিহাস জানে না, যুদ্ধ সম্পর্কেও জানে না। আমি শুরু করেছিলাম রাজাকার ক্যাম্প গুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন। বেশ কয়েকটা রাজাকার ক্যাম্প আত্মসমর্পণ করে পরে শপথ নিয়ে আমার সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তারা আমার সাথে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তাদের অনেককেই রাজাকার হিসেবে অবজ্ঞা করা হয়, কিন্তু আমি জানি তারা মুক্তিযোদ্ধা। তারা আমার সাথে কোরআন শরীফে হাত রেখে বুলেট রেখে শপথ করেছিল শেখ মুজিবের আদর্শে অনুগত থেকে বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ করবো যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি তবে যেন বুলেটে আমাদের মৃত্যু হয়। এই শপথ করে তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারাও মুক্তিযোদ্ধা।

চলনবিল প্রবাহ: এটা একটি চমকপ্রদ তথ্য। যারা পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিল তাদেরকে আপনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদেরকে কনভার্ট করে ফেললেন। কিন্তু এটা পাকিস্তান বাহিনী কিংবা তাদের পক্ষের লোকজন কিভাবে নিল?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: পাকিস্তান বাহিনী কিংবা তাদের পক্ষের লোকজন এটা জানতে পারেনি। কারণ আমি একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আমার কৌশল জানা ছিল। আমরা কুকুর কিংবা ছাগল মেরে নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পে সেগুলোর রক্ত ছড়িয়ে দিতাম এবং গুলি করে বিভিন্ন জায়গায় ঝাঁঝরা করে রাখতাম। দেয়ালে দরজা-জানালায় গুলি করে রাখতাম। পরে এদেরকে নিয়ে উধাও হয়ে যেতাম। তাছাড়া নানানভাবে নানান কৌশলে এদের সাথে যোগাযোগ করতাম। এসব অনেক কথা, বলতে গেলে আরো অনেক সময় লাগবে। তবে আফসোস হলো এসব কথা কেউ কোনদিন জানতে চায়নি। যারা যুদ্ধ করেছে তারা যোদ্ধা; যারা যুদ্ধ করেনি তারা কেমন করে যোদ্ধার কাহিনী বলবে? প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে কোন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অঞ্চলের মানুষ আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী জানতে চাইনি। শুধু দু বছর আগে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সেখানে কিছুটা বলেছিলাম। আমি এই মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছু জানি, অনেক ঘটনার সাক্ষী, এসবকথা বলা সময় সাপেক্ষ। আমরা গ্রামের মানুষ বলেই আমরা অবহেলিত হয়ে রয়ে গেছি। আমি যদি শহরের কেউ হতাম কিংবা আমার বাড়ি যদি ঢাকা শহরে হত হয়তো আমি অনেক এওয়ার্ড পেতাম অনেক সুনাম হতো আমার। কিন্তু আমি সেসব চাইনি, আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই আমার গর্ব। আমার দেশের পতাকা আমার সার্টিফিকেট। আমার কোন কাগজের সার্টিফিকেট নেই।

চলনবিল প্রবাহ: কখন বুঝতে পারলেন যে মুক্তিযুদ্ধে আমরা বিজয়ী হতে যাচ্ছি? ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের সময়ের অনুভূতি জানতে চাই?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: ১৬ই ডিসেম্বরের সপ্তাহখানেক আগে আমাকে আবারো ভারতে যেতে হয়। কারণ আমি আগেই বলেছি চৌদ্দশ ছেলেকে আমি প্রশিক্ষণ দিয়েছি, কিন্তু যে হারে অস্ত্র-গোলাবারুদ আসার কথা ছিল সেভাবে সাপ্লাই আসছিল না। সে কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা রেজুলেশন নিয়ে আমাকে ভারতে যেতে হয়। আমি যখন বাঙালিপুর ক্যাম্পে গেলাম, সেখানে ইনু ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হলো। উনি বললেন চল তোকে নিয়ে ঘুরি, একটা জিপে করে আমরা মালদার দিকে যাচ্ছিলাম তখন পথে উনি আমাকে বলল যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, আমাদের যুদ্ধ করার লাগবে না। ইন্ডিয়ান আর্মি বাংলাদেশে প্রবেশ করবে, আমাদেরকে ওদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। যদিও আমরা পাকিস্তান আর্মিকে বেহাল অবস্থায় ফেলেছিলাম। ইন্ডিয়ান আর্মি বলতে গেলে ফাঁকা মাঠেই বিজয় অর্জন করতে পেরেছে। তবে একথা অনস্বীকার্য ইন্ডিয়ান আর্মি না আসলে আমাদের জয় পেতে আরও অনেক বেশি সময় লাগত। আমি ক্যাম্পে থেকে দেখলাম শাশা করে ইন্ডিয়ান আর্মির বিমান বাংলাদেশ প্রবেশ করছিল। এরমধ্যে পাকিস্তান আর্মি আত্মসমর্পণ করলো। আমি ১৭ ডিসেম্বর আবার দেশে প্রবেশ করলাম।

চলনবিল প্রবাহ: বিজয় অর্জনের পর আপনি গ্রামে গিয়ে কি করলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: না, আমি গ্রামে যাওয়ার আগে প্রথমে আমি যে এলাকায় সবাইকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি সেই এলাকায় গিয়েছি, যাদের যাদের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল তাদেরকে আমি বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। ইউনুস এবং আব্দুল জলিলকে আমি পাঠিয়ে দিলাম, যাও তোমরা গ্রামে চলে যাও গিয়ে রাজাকার, শান্তি কমিটি এদের সবাইকে এরেস্ট করো, কিন্তু এদেরকে মেরে ফেলো না। কারণ আমাদের একটা প্ল্যান আছে এদেরকে নিয়ে। যে জন্যে তোমরা যাও। ওদেরকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি তখন আমার বাকি যে ছেলেদেরকে বাড়ি পৌঁছানোর কথা ছিল তাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তিনদিন পরে আমি আমার গ্রামে গেলাম। এর আগে আমি এই অঞ্চলেই ছিলাম, এবং এই অঞ্চলের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছি বিভিন্ন জনসভা করে।

চলনবিল প্রবাহ: আপনার যুদ্ধের এরিয়া ছিল নওগাঁ জেলা? আর আপনার বাড়ি হলো নাটোরের চলনবিলে। গোটাটাই চলনবিল অঞ্চল। নাটোরের গুরুদাসপুরে আপনার গ্রামে যখন ফেরত যান, আপনার ঐ দিকের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের যারা ছিল আরও যেসব পরিবার থেকে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তাদের কি অবস্থা ছিল? পাকিস্তানিরা বা রাজাকাররা তাদের কী ধরণের ক্ষতি করেছিল?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমি যখন যুদ্ধের জন্য রওনা হই, তখন আমার পকেটে দুইশো টাকা ছিল। প্রথমেই আমি ৬-৭ মাইল যাওয়ার পরে আমি দেখলাম যে আমাদের পাশের গ্রামের হিন্দু ভাইবোনরা তারা ইন্ডিয়া যাচ্ছে। তাদের কষ্ট দেখে আমি ১০০ টাকা দিয়ে চাল ও মাছ কিনে তাদেরকে খাওয়ালাম। তারপর তাদেরকে সাথে নিয়ে রওনা করে দিলাম। ওদের আশ্রয় শিবিরে দিয়ে আমি ফেরত আসলাম। আমি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে আবার ওদের খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। সেখানে দুলাল চন্দ্র, আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ওদেরকে খুঁজে বের করলাম। একটা বড় রুইমাছ কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। কাকীমাকে বললাম, যে রুই মাছটা রান্না করেন, আমরা সবাই মিলে খাই। সেখান থেকে ওদের সাথে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। তারপরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে যখন আমার অঞ্চলে আমি ফিরে আসলাম। তখন তো হিন্দুদের ভিটেতে সরষে বোনা ছিল। ঐ সময়ের যেই ফসল সেইটা বোনা ছিল। আমি রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকজনদেরকে একত্র করি, জনগণকে ডেকে জনসভা করি। তাদেরকে আমি বলি যারা হিন্দুদের জমি, ঘরবাড়ি লুট করেছে, তাদের গরু, সোনাদানা লুট করেছে তাদের প্রত্যেককে এটা ফেরত দিতে হবে। শুধু ফেরত না যে ১০ টা টিন নিয়ে যে ঘর করেছে সেই পুরো ঘর ওদের ভিটেতে চলে যাবে। এই শান্তিকমিটি আর রাজাকারদের আমি লাগিয়ে দেই। আমি একটা টাকাও সরকারের কাছ থেকে না নিয়ে পুরো হিন্দুর গ্রাম আমি সব তৈরি করে দিয়েছিলাম এইভাবে। তারপরে আমি থানা থেকে গম, চিনা এইগুলোর সিডস(বীজ) নিয়ে তাদের জমিতে রোপণ করিয়ে সেখানে আমি ফসলও রোপণ করে দিয়েছিলাম। অতএব তারা যখন ফেরত আসে, তখন অবাক হয়ে যায়। ঐ জমানায় আমি দুইশো টাকা করে বড়লোকদের কাছ থেকে চান্দা নিয়ে ওদেরকে থালাবাটি, হাড়ি পাতিল এবং গোডাউন থেকে প্রাইমারি কিছু খাবার নিয়ে আমি প্রত্যেকের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। এবং যেই সমস্ত হিন্দু ভাইয়েরা এখনও বেঁচে আছে তারা বলবেন, অনেকে বিশ্বাস করেননি যে এটা তাদের বাড়ি। কারণ অনেকেএ বাড়িতে টিনের ঘর ছিলনা, কিন্তু এসে দেখে সেখানে টিনের ঘর। তারা যে কতো খুশি ছিল সেটা তো এই সংক্ষেপ টাইমে কী বলবো। মুক্তিযুদ্ধের গল্প আর কী বলবো? যারা যুদ্ধ করেনি তারা গল্প শোনায়, কেউ শুনতে চাননি আমাদের গল্প।

চলনবিল প্রবাহ: আপনার ছোট ভাইও (শরীফুল আলম) মুক্তিযুদ্ধ করেছে, এবং সেও দেরাদুন ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়েছে কিন্তু আপনি কিছুই জানতেন না। যখন জানলেন তখন কী আপনি সার্প্রাইজড হয়েছিলেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: সেই অনুভূতি তো এখন প্রকাশ করা সম্ভব না। কারণ ঐ যে মায়ের কথা বললাম, মা’ই ওকে বকেছে যে তোর ভাই চলে গেলো, তুই বাড়িতে বসে আছিস কেনো? বকে বকে ওকেও বের করে দিয়েছে। এবং স্থানীয়ভাবে যেহেতু আমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি, কতো রকম অত্যাচার তাকে সহ্য করতে হয়েছে, তাকে কতো কথা শুনতে হয়েছে। সেই জন্যে সে অগাস্ট মাসে, আমি যখন বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করি, তখন অগাস্ট মাসে সে ইন্ডিয়াতে যায়। এবং পরে পর্যায়ক্রমে সেও দেরাদুনে চলে যায় ট্রেনিংয়ের জন্যে। আমাদের অঞ্চল থেকে তিন-চারজন ওরা গিয়েছিল কিন্তু আমি তো কিছুই জানতাম না। তখন তো আর কোনো যোগাযোগের অবস্থাই ছিলনা। আমি নামাজ পড়তাম সবসময়। আল্লাহকে ডেকেছি, দোয়া করেছি সবার জন্য, আল্লাহ যেনো সবাইকে হেফাজত করে। কিন্তু ঐ যে বললাম যে কোনো নেতাই আমাকে সাথ দেয় নাই, কিন্তু ঐ সময়ে কেউ কেউ গেছে তাদের সাথে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শুধু আমার ছোট ভাই-ই নিয়েছে। আরও কিছু ছাত্রও প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। আমার জানামতে, সে সময়ের কোনো নেতা মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রশিক্ষণ নেয় নাই।

চলনবিল প্রবাহ: বাংলাদেশ থেকে আপনি উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গেলেন। এবং আমেরিকাতে আপনি অত্যন্ত সুনামের সাথে আরও ডিগ্রি অর্জন করে ডাক্তারি প্রাকটিস করছেন এবং সেটাও অনেকদিন হয়ে গেলো। ডাক্তারদের ওখানে একটা বড় রকমের আয় হয়, সেই আয়টা কী দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে আবার দেশের কাজে লাগানোর জন্য পাঠান নাকি ঐখানেই আপনি সব করছেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আল্লাহতায়ালা আমার উপরে অনেক রহম করেছেন। আমি জীবনে যা চাইনি সেইগুলো আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন হয়তো পরীক্ষা করার জন্যে। আমার স্পেশালটি হলো গ্যাস্ট্রোইন্ট্রোলজি। আমি গ্যাস্ট্র ইন্ট্রোলজিতে প্রাকটিস করি। আমার যখন ট্রেনিং শেষ হলো তখন আমি সাত মাসের জন্যে তবলিগ জামায়াতে গিয়েছিলাম। সেইটা ধর্মীয় দিকটা আমাকে খুলে দেয়। আমার বুঝতে তখন সুবিধা হয় যে এই দুনিয়ার জীবনের মানে কী। আমার দেশাত্মবোধও আমি কোনোদিন-ই ভুলিনি। অনেক কাহিনী বলার আছে, কেনো আমি আমেরিকাতে এসেছি। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি জীবনে কোনোদিন আমেরিকাতে আসবো। কিন্তু পরিস্থিতি, অত্যাচার এবং অবিচার ঐ সময়ের যা আমাকে বাধ্য করেছিল আমেরিকা আসতে। কিন্তু এখানে এসেছি আমার দেশের খেদমত করার জন্যে। অতএব আমি যা কিছু এই দেশে আয় করেছি তার কমপক্ষে ৭০-৭৫ ভাগ আমি দেশের মানুষের পেছনেই খরচ করেছি। যা আপনাকে বলা সম্ভব নয়, কারণ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে গুনাহ হবে। কিন্তু আমাদের অঞ্চলের অনেকেই জানে আল্লাহ আমাকে দিয়ে কি করিয়েছেন। কক্সবাজারে করেছি, ঢাকাতে করেছি, আমার গ্রামে, আমার অঞ্চলে। পুরো বাংলাদেশই আমার অঞ্চল। যেখানে যখন সুযোগ এসেছে আমি সেখানে কিছু করার চেষ্টা করেছি। এবং সেই কারণেই আল্লাহ তায়ালা কীভাবে না কীভাবে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও আমার কাছে নিয়ে আসেন। আজকে প্রায় ২৩/২৪ বছর ধরে আমি ওনার চিকিৎসা করছি এবং ওনার সাথে আমার সম্পর্ক ভাই এবং বোনার মতো। কারণ শেখ কামাল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। আমার ক্লাসমেট। আমরা একসাথে ঢাকা কলেজে পড়েছি। এইজন্যই শেখ কামালকে উনি হারিয়েছেন বটে, কিন্তু আমি ওনাকে এটাই বলার চেষ্টা করেছি, শেখ কামাল বেঁচে আছে। তাকিয়ে দেখেন আমার দিকে। এটাই হলো আমাদের সম্পর্ক। এই জন্য বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্ন। বাংলাদেশকে নিয়েই আমি স্বপ্ন দেখি।

চলনবিল প্রবাহ: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আপনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদে নির্বাচিত জেনারেল সেক্রেটারি(জিএস) ছিলেন। আমরা দেখছি যে সেই সময়ে যারা রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন, তারা এখন বড় বড় পদে আছেন, বড় বড় নেতা হয়েছেন। তো আপনার সেই সুযোগ থাকার পরেও আপনি রাজনীতিতে আসলেন না কেন?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমি রাজনীতি করিনি এটা না, আমার রাজনীতি হলো গঠনমূলক রাজনীতি, ধ্বংসাত্মক না। এ জন্য আমি যেটা বললাম, আমি হিন্দু পাড়ার সমস্ত বাড়িঘর করে দিয়েছি, কোনোরকম সরকারি অনুদান ছাড়া। মেডিকেল কলেজ চত্ত্বরে অভিষেক যখন হলো, আমি দুই হাজার গাছ লাগিয়েছি। মেডিকেল কলেজ চত্ত্বরে গেলে অনেক গাছ আমার নামে স্বাক্ষী দিবে, যা আমার নিজের হাতে লাগানো। এরপরে যখন আমি ছাত্রদেরকে খুশি করতে পারিনি, তাদের সাথে আমি অসৎ হতে পারিনি, আমাকে মার খেতেও হয়েছে কিন্তু আমি প্রতিবাদ করিনি, কারণ ওরা অবুঝ। আমি অনেক ছেলেকে রক্ষীবাহিনীতে ঢুকিয়েছিলাম, সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়েছিলাম, তারা প্রতিশোধ নিতে আমার কাছে এসে বলেছিল, কে আপনার গায়ে হাত তুলেছে বলুন? তাদেরকে আমি একটা কথাই বলেছিলাম, তাহলে তো আমি ওদের চেয়েও খারাপ হয়ে গেলাম। পরবর্তীতে এরা সবাই এসে আমার কাছে মাফ চেয়েছে, অনেকে পা ধরেছে পর্যন্ত মাফ করে দেয়ার জন্য। তাই সুযোগ কী? আমি মন্ত্রী হতে পারতাম বা একটা কিছু হতে পারতাম। কিন্তু এখন আমি আমার আপাকে যা বলতে পারি, আমরা যে সমস্ত আলাপ-আলোচনা করতে পারি তা অনেক নেতা বা মন্ত্রী তো এটা করতে পারেনা। কারণ আমরা ঘরোয়া ভাবে আলোচনা করি, ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা করি। যেটা অনেক সময় বলা প্রয়োজন, কিন্তু অনেকে বলতে ভয় পায় সেগুলোও আমরা আলোচনা করি। উনি সব সময় সেগুলোর প্রশংসা করেন, ভালোবাসেন। এজন্যেই উনি জানেন যে, এরা আমার কাছে কিছু চায়না, সে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নিয়ে এখানে কোনোদিন আসবেনা। এমনকি আমি কসম খেয়ে তাকে কথা দিয়েছি, যে আমি কখনও সুপারিশ করতে আপনার কাছে আসবো না। আমার সুপারিশ বাংলাদেশের জন্যে কোনো ব্যক্তির জন্যে না। অবশ্যই আমার ফ্যামিলির জন্যে না। এই নীতিতে আমি বিশ্বাস করি এবং সেই নীতি নিয়ে কাজ করছি।

চলনবিল প্রবাহ: আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার একটা টার্গেট ছিল। সেটাও আমাদের পূরণ হয়ে গেছে, আমরা এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিশেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছি। এবং সামনে হয়তো মধ্যম মাধ্যম আয়ের দেশ হবো। কিন্তু একটা কথা বলা হচ্ছে বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা বেড়েছে। কয়েকটা পদ্মাসেতুর টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আপনারা যারা প্রবাসে আছেন তারা সেই দেশ থেকে আমাদের দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন আর আমাদের দেশ থেকে টাকা কানাডা, দুবাই, মালয়েশিয়ায় বেগম পাড়া বা সেকেন্ড হোম তৈরি হচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিশেবে এইগুলো দেখতে আপনাদের কেমন লাগে? বা এইগুলো নিয়ে আপনারা কথা বলেন কিনা?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: আমাদের সুখের দিকটা হলো দেশের উন্নয়ন আর দুঃখের দিকটা হলো দুর্নীতি। আমি অনেক জায়গায় বলেছি যে, বাংলাদেশ লুটারদেরকে লুট করা সুযোগ করে দেয়ার জন্যতো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি, দেশ স্বাধীন করিনি। এমন একটা ভাব হয়েছে যে যত ভন্ড ধড়িবাজ, আজ সেই তত বলবান, ভগবান ভগবান। সত্যি কথা বলা যায় না বাংলাদেশে। সত্যি কথা বলতে গেলে তাদেরকে খুন করা হয়, গুম করে দেয়া হয়। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার কথা কেউ বলতে পারবেনা যে, উনি কোনো রকমের দূর্নীতি করেন। ওনার স্বপ্ন একটাই যে, পিতার স্বপ্নকে আমি বাস্তবায়িত করবো। সোনার বাংলা গড়বো। দূরদর্শিতা ওনার আছে, এইজন্যই তো উনি এই স্বপ্ন দেখতে পারেন। মধ্যম আয়, উন্নত দেশ এবং আগামী ১০০ বছর পরে কি হবে এগুলোর স্বপ্ন কে দেখতে পারে? রাজনীতি হলো আমি করবোটা কি সেটা মানুষের সামনে তুলে ধরা। নেপালে আমি গিয়েছিলাম রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে। তখন তারা বলেছিল ঐ সময়ের রাজারা আমাদেরকে বলেছিল যে ডেভেলপের প্ল্যান হলো তুমি তোমার এলাকাতে কি করবে সেইটা বলে মানুষের কাছে ভোট চাওয়া। এইটা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমরা যারা সুযোগ পেয়েছে তারাই লুটেপুটে খাচ্ছে আর যারা পায়নি তারা পায়নি বলে রাজনীতি করছে তাদের বিরোধিতা করে। কিন্তু তারা কি করবে সেটা কেউ বলছেনা। এটা খুব দুঃখজনক। এটা পরিবর্তন করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আসতে হবে। ঈমান যাদের ভিতরে নাই, আল্লাহর ভয় যাদের ভিতরে নাই তাঁরা এসব করে। আমাদের নেত্রী কী বলেন? উনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে কিন্তু কালকে উনি চলে গেলেন দুনিয়া থেকে। সেটা করোনাতেই বা ক্যান্সারেই হোক বা যেভাবেই হোক। এই দুনিয়াতে তো আমরা কেউ থাকতে আসিনি। কিন্তু আমরা যদি মানুষের জন্য ভালো কিছু করে যাই। তারা তো আমাদের জন্য দোয়া করবে। আমরা তো মুসলমান, আমরা তো দোয়া চাই। আমাদের কামিয়াব হলো আখেরাতে। আমরা যদি বেহেশতে না যেতে পারি, জাহান্নামেই যদি পুড়তে হয়, তাহলে কী এই লুটেপুটে খেয়ে জাহান্নামের পথ আমরা করে যাচ্ছি? আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দিক। নতুন প্রজন্মের কাছে আমি আপিল করি, তোমরা এই দেশকে বাঁচাও। তোমরা জাগো, তোমরাই তো দেশকে স্বাধীন করেছিলে। কেনো তোমরা এখন প্রতিবাদ করতে পারো না? কেনো তোমরা রাস্তায় নামতে পারো না, এই দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে? কেনো তারা লুটেপুটে খাওয়ার সুযোগ করে নিচ্ছে, আর তোমরা নিরব দর্শক হয়ে দেখছো? আমাদের তো বয়স হয়ে গেছে, তবুও আমরা বলেছি আবার যদি নেত্রী ডাক দেয়, আমরাই প্রথম সারিতে থাকবো। কাউকে না কাউকে জাগতে হবে, নেত্রীর হাতকে শক্ত করতে হবে। উনি তো একা সব পরিবর্তন আনতে পারবেন না। পরিবর্তন আনতে সবাইকে সততা দেখাতে হবে, সবাইকে দেশাত্মবোধ দেখাতে হবে।

চলনবিল প্রবাহ: আপনাদের চলনবিল অঞ্চল নিয়ে কিছু বলেন। চলনবিল নিয়ে আপনাদের কী স্বপ্ন আছে? এবং চলনবিল মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি দুর্গম অঞ্চল ছিল। এবং আপনারা সেখানে যুদ্ধ করেছেন। এখন চলনবিলের অনেক উন্নতি হয়েছে, চলনবিলের রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সবই হয়েছে। চলনবিল নিয়ে আপনাদের আর কোনো স্বপ্ন, কিংবা চলনবিলের কোনো কথা যদি আপনি বলতে চান।

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: চলনবিল তো আমার গ্রাম, আমার বাড়ি, আমার এলাকা। আমার বড় ভাই (মরহুম অধ্যক্ষ এম এ হামিদ) ব্রিজের কাজ শুরু করেছিলেন কিন্ত সেই ব্রিজ সম্পূর্ণ হচ্ছিল না। অনেকবার অনেক এমপি সাহেবরা বলেছেন এটা শেষ করবেন, কিন্তু দেরি হচ্ছিল। আপা বলেছিলেন আমি ইলেক্টেড হলে প্রথমে আপনার ব্রিজ করে দিবো। আল্লাহর রহমতে ২০০৮ এ যখন উনি নির্বাচিত হলেন, তখন প্রথম মিটিংয়েই আমাদের ব্রিজের জন্য ১৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। আমাদের গুরুদাসপুরের কলেজ সরকারি করে দিলেন। আমাদের এলাকায় যেই রাস্তা হয়েছে এগুলো আমি নিজের হাতে এঁকে ছিলাম কোন কোন রাস্তা দরকার। কোন দিকে রাস্তা যাবে সব। আমি স্বাক্ষী রাখছি আজগার ভাইকে, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আজগার ভাইকে (অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্রীপুর বালিকা বিদ্যালয়) জিজ্ঞেস করতে পারে সবাই। আজগার ভাইকে ডেকে নিয়ে কাগজে এঁকে (আমার কাছে সেই এপ্লিকেশনের কপি এখনও আছে) সেই এপ্লিকেশনে কোন গ্রাম থেকে কোন রাস্তা যাবে, কোথায় ব্রিজ হবে, এগুলো সব এঁকে এঁকে তখনকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাহেব, ওনাকে বড় ভাই বলে ডাকি আমরা। বড়ভাই বললেন যে এই রাস্তাঘাট নিয়ে নেত্রীকে ঝামেলা করিয়েন না, এগুলো সব আমাকে দেন, আমি দায়িত্ব নিচ্ছি এগুলো করে দিবো। তারপর অনেক বাধাবিপত্তি, অনেকেই বাধা দিয়েছে তথাপি উনি নিজের তত্ত্বাবধানে উনি এগুলো করে দিয়েছেন। যা আমাদের অঞ্চলের কেউ জানেনা, কারণ আমি কোনোদিন চাইনি নিজে ক্রেডিট নেয়ার জন্যে, আমি এটাতে বিশ্বাস করিনা। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা যেহেতু আমি এই অঞ্চলের মানুষ, আমি তাদেরকে সবসময় সমর্থন দিয়েছি। আমি কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে যে একে অপরের বিরুদ্ধে আমি লাগিয়ে দেই এই রকম রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করিনা, সবাইকে আমি সমভাবে দেখি।

চলনবিল প্রবাহ: চলনবিল অঞ্চলের কৃতি সন্তান মরহুম অধ্যক্ষ এম এ হামিদ আপনার বড় ভাই। উনি একটা স্বপ্নের কথা বলতেন, যে চলনবিলের যে ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্তা এটা বজায় রাখার জন্য, চলনবিল যে তিনটা জেলার আটটা থানা নিয়ে গঠিত। সেই চলনবিলকে আলাদা স্বতন্ত্র জেলা করা যায় কিনা? এ রকম কোনো প্রস্তাব, কোনো স্বপ্ন আপনিও দেখেন কিনা? কিংবা এটাকি বাস্তবায়ন যোগ্য কিনা?

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির:চলনবিলকে জেলা করতে হলে বর্তমানের কয়েকটি জেলার কিছু কিছু অংশকে এক জায়গায় আনতে হবে। যে রকম আমরা হলাম গুরুদাসপুর থানা, শুধু গুরুদাসপুর থানার এলাকা নিয়ে চলনবিল জেলা করা সম্ভব নয়। এখানে সিংড়া আছে, সিরাজগঞ্জ, পাবনা আছে, আরো বিভিন্ন এলাকা আছে। আমাদের মাননীয় এমপি সাহেব আব্দুল কুদ্দুস ভাই, ওনার সাথে আমি বসে কথা বলেছি কয়েকবার এটা নিয়ে আলোচনা করেছি উনি আর কিছু এমপি সাহেবরা এর সাথে যোগ দিতে রাজি আছেন, যেমন তাড়াশের এমপি। আবার কিছু কিছু এলাকার এমপি, মন্ত্রি যারা আছেন, আমি নাম বলতে চাচ্ছিনা, ওনারা এটাতে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এইজন্য আমরা এটা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি, চিন্তা করেছি। আমি যেহেতু ঠিক করেছি আগামীতে বাংলাদেশে চলে আসবো ইনশাআল্লাহ, তারপরে ওনাদের সাথে আমি ব্যক্তিগত ভাবে গিয়ে দেখা করে চেষ্টা করবো। চলনবিলের উন্নয়নের জন্যে মেগা প্রজেক্ট নেয়া হচ্ছে, এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। গত ফেব্রুয়ারিতে যখন আমি দেশে গিয়েছিলাম সেই সময়ে আমি আমাদের উপজেলা চেয়ারম্যান এবং এমপি সাহেবকে নিয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করেছি সব বিষয়েই কথা বলেছি। উন্নয়ন তো চলতেই থাকবে জেলা হোক বা না হোক উন্নয়ন চলতে থাকবে এবং আমারা এর পেছনে লেগে থাকবো। আমি যখন দেশে আসবো তখন এটাকে জেলা করা সম্ভব কিনা একটা উদ্যোগ নিবো ইনশাআল্লাহ।

চলনবিল প্রবাহ: নতুন প্রজন্মকে আপনি কীভাবে দেখতে চান? তাদের উদ্দ্যেশ্যে যদি কিছু বলেন।

ডা. সিরাজুল ইসলাম শিশির: নতুন প্রজন্মের কাছে একটাই উদাহরণ হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার আদর্শ, তার অনুপ্রেরণা সেটাই হলো আমাদের উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধ কখনও ঘোষণা দিয়ে হয়না, মুক্তিযুদ্ধ করতে হলে জাতিকে উদ্ভুদ্ধ করতে আমাদের পেছনে যেটা প্রেরণা ছিল, সেটাই হলো আমাদের শক্তি। আমরা যেন বিপদগামী না হই, অন্যদের প্ররোচনায় যেন আমরা পাকিস্তানমুখী না হই। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা। যেটার জন্য আমাদের নেত্রী আজকে জানপ্রাণ দিয়ে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তার হাতকে শক্ত করতে হলে আমাদের নতুন প্রজন্মের দরকার। এ দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে শেখ মুঝিবের সৈনিক হয়ে আমরা এখনো বেঁচে আছি যতদিন পর্যন্ত ও দেশ দুর্নীতি মুক্ত না হবে, এ দেশের মানুষ খেয়ে-পরে সুখে শান্তিতে বসবাস না করবে ততদিন পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবো, এটাই হবে আমাদের এই জমানার মুক্তিযুদ্ধ। একমাত্র নতুন প্রজন্মের কাছেই আমি আমি এই আহবান করি। আমাদের বয়স তো শেষ হয়ে গেছে, আমরা যে কোনোদিন দুনিয়া থেকে চলে যাবো। কিন্তু তোমরা আমাদেরকে কথা দাও যে তোমরা দাঁড়াবে, সমগ্র বাংলাদেশকে তোমরা জাগিয়ে তুলবে এই দূর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে। আল্লাহ তোমাদের সহায় হোক, আমাদের জন্যে দোয়া করো। আর আমাদের কোনো ভুলভ্রান্তি হলে বা কথা মধ্যে বা আকারইঙ্গিতেও যদি আমি কাউকে কিছু বলে থাকি আমাকে মাফ করে দিবেন। এটা আমার নীতি না, আমি কাউকে ছোট করিনা। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করেছেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের শুভেচ্ছা ও মোবারক বাদ জানাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে