বঙ্গমাতা: অনুপ্রেরণার অপর নাম

0
140

এ্যাড . কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি: ”বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কবিতার লাইন দুটির সার্থকতা প্রমাণেই হয়তোবা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্ম হয়েছিলো। আজ এই মহীয়সী নারীর ৯১তম জন্মবার্ষিকী। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে ১৯৩০ সালের ৮ই আগস্ট বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার ডাক নাম ছিলো রেনু। সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর চাচাতো বোন ছিলেন তিনি। খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু ও তার ঘরে দুই কন্যা ও ৩ ছেলের জন্ম হয়। চিরকাল তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে তার শক্তি হয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম, জেল-জুলুমের মধ্যেই জীবন কাটিয়েছেন তখন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সন্তানদের মানুষ করেছেন।

১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ কিংবা ১৯৭১ প্রতিটি সময়ে জাতির পিতাকে তিনি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন দেশের মানুষের জন্য কাজ করার। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন তিনি তখন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে সেটা সকলের কাছে পৌঁছে দিতেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেও নেতাকর্মীরা তার কাছে ছুটে আসতো।তিনি তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন। এককথায় তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর। ‘৬৬ সনের ছয় দফার পক্ষে জনগণকে একাট্টা করতে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরাসরি কাজ করেছিলেন। দলের যে কোন কর্মী সমস্যায় পড়লে তাদের আশ্রয় ছিলো বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলেও বিপদে পড়ে কোন নেতাকর্মী বেগম মুজিবের কাছে আসলে তিনি তাদের আপ্যায়ন করতেন ও সমস্যা দূর করার ব্যবস্থা করতেন। তিনি একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিষয় তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে দেশের মানুষের আন্দোলনকে দুর্বল প্রমাণ করতে চায় পাকিস্তান ও এদেশের ষড়যন্ত্রকারীরা। তিনি নিজের অলংকার বিক্রি করেও বিভিন্ন সময়ে দলের প্রয়োজন মিটিয়েছেন।

আমাদের কাছে অমূল্য বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে লেখা “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”- এখানেও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান আছে। তিনিই জাতির পিতাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তার জীবনের ঘটনাগুলো লিখে রাখার জন্য এবং জেলে তিনিই বঙ্গবন্ধুকে খাতা কলম দিয়ে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা ও তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য। এখানে জড়িত ছিলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পূর্বেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে সতর্ক করা হয়েছিলো। তাদের স্থান পরিবর্তন করতেও অনুরোধ করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা কেউ-ই বিশ্বাস করেনি যাদের জন্য এতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন তারা তাদের হত্যা করতে পারে। নিয়তি কত নিষ্ঠুর-নির্মম! ঘাতকের গুলির আঘাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনিও নিহত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দেশের জন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে “বঙ্গমাতা” উপাধি প্রদান করা হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিলেন এক অনুপ্রেরণা ঠিক তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আজকে আমাদের বিশেষ করে নারীদের তাকে নিয়ে আরো অনেক জানতে হবে। কিভাবে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে (জেলে থাকার সময়) পরিবার সংসার সামলে তিনি দলের খোঁজ খবর রেখেছেন, কর্মীদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন।এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের সকলের কাছেই এক অনুপ্রেরণার নাম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। মহীয়সী এই নারীর জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখকঃ সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ। সভাপতি, কল্লোল ফাউন্ডেশন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে