বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা অর্থ পাচার প্রতিরোধে কঠোর বিধান

0
69

অর্থ পাচার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা রেখেই প্রণয়ন করা হচ্ছে বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা।

এর আওতায় নির্ধারণ করা হবে কোম্পানির মোট মূলধনের কত শতাংশ বিনিয়োগ যোগ্য, বিনিময়ে কত টাকা মুনাফা দেশে আসবে। এছাড়া কোন কোন কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করছে, বিনিয়োগের অর্থ শিল্পায়নে ব্যবহারিত হচ্ছে কিনা- এসব বিষয়ে থাকছে মনিটরিং ব্যবস্থা।

পাশাপাশি এ নীতিমালা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানায়, নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সবার জন্য বিদেশে বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা হবে না। প্রথমে আবেদনকারী প্রতিটি কোম্পানিকে পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে ‘কেস টু কেস’ ভিত্তিতে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশে ঢালাও বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করা হলে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের ওপর চাপ সৃষ্টি ও দেশ থেকে টাকা বেরিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ ক্ষেত্রে নীতিমালা ঠিক করা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ইতোমধ্যে নীতিমালা প্রণয়নসংক্রান্ত কমিটি একটি বৈঠক করেছে। সেখানে উল্লিখিত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

জানতে চাইলে বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি এবং বিডার সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল  বলেন, একটি নীতিমালা থাকা ভালো। তবে এটি কবে কার্যকর হবে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

এখন পত্রপত্রিকায় দেখা যায় বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ নীতিমালা করা হলে কে কি পরিমাণ অর্থ বিদেশে নিচ্ছে, সেখান থেকে কি পরিমাণ মুনাফা আসছে এর একটি হিসাব পাওয়া যাবে। পাশাপাশি অর্থ পাচারও কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের অবস্থা ভালো। এতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে না। কারণ বিনিয়োগে শুধু টাকা চলে যাবে তাই নয়, বিনিময়ে মুনাফাও আসবে দেশে।

অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেব প্রসাত দেবনাথ। তিনি  বলেন, ‘কেস টু কেস’ ভিত্তিতে বিদেশে বাংলাদেশি কোম্পানির বিনিয়োগের অনুমতির বিধান রেখেই নীতিমালা করলে ভালো হবে। কারণ বাংলাদেশিদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত গণহারে বিনিয়োগের বিধান থাকা ঠিক হবে না। যে বিনিয়োগ বিদেশে শিল্পায়ন করবে কিন্তু পাচারের জন্য নয়- এমন প্রতিষ্ঠানকেই অনুমতি দেয়া যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে। করোনা পরিস্থিতি বাদ দিলে আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। আর যখন প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায় তখন ধরে নিতে হবে দেশে শিল্পায়ন বাড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে এবং অন্যান্য সূচকে ভালো করছে।

এক শ্রেণির মানুষের কাছে অর্থ আছে। এসব উদ্যোক্তা এখন বিদেশে বিনিয়োগ করতে চান। পাশাপাশি ভারত, সিঙ্গাপুরসহ অন্য দেশগুলো এ সংক্রান্ত নীতিমালা করে অনেক আগেই উন্মুক্ত করেছে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য।

বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশি কোম্পানির বিদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক রক্ষণশীল। বর্তমান আইন অনুযায়ী বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো চাইলে বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। যদিও ব্যাংকিং সূত্রগুলো বলছে, অনুমোদন ছাড়াই অনেকেই অবৈধ পথে অর্থ নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছেন।

আরও জানা গেছে, নীতিমালা প্রণয়নসংক্রান্ত কমিটির প্রথম বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খলিলুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ নীতিমালায় একটি এক্সিট পলিসি থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক আবু সালেহ মুহম্মদ সাহাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দিতে পারে।

আর এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক সালাউদ্দিন আলমগীর বলেন, এখনই যথার্থ সময় বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা করার। কারণ অনেকে অবৈধ পদ্ধতিতে বিদেশে বিনিয়োগ করেছে। নীতিমালা হলে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার বন্ধ হবে।

ওই বৈঠকের সুপারিশে আরও বলা হয়, এ সংক্রান্ত নীতিমালা করার আগে বিদেশে বাজারের চাহিদা জানার প্রয়োজন। আর একই নীতিমালা দিয়ে যেন ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকাসহ সব ধরনের বাজারে প্রবেশ করা যায়। আর একটি কোম্পানি তার কত শতাংশ শেয়ার বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারবে সেটি স্পষ্ট করতে হবে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, সিঙ্গাপুরের নীতিমালা থাকলে সেটি পর্যালোচনা করা দরকার।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম  বলেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি অর্থ পাচারের একটি ঝুঁকি থাকবে। তবে সেটি প্রতিরোধ করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ থাকবে এ সংক্রান্ত বিধিমালায়।

বিনিয়োগের নামে ইচ্ছেমতো টাকা নেয়া যাবে এমনটি নয়। এ নিয়ে ‘বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি’ কাজ করছে।

তিনি বলেন, প্রথমে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি হোক। সেটির ওপর সবাই মতামত দিতে পারবেন। এরপর এটি চূড়ান্ত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন। এর মানে কি তারাও সব টাকা নিয়ে আসতে পারেন। সবকিছু বিবেচনা রেখেই খসড়া তৈরি করা হচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে