বড়াইগ্রামে গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যার আসামি গ্রেফতার

0
70

নিজস্ব প্রতিবেদক, বড়াইগ্রাম: পরকীয়ার জেরে নাটোরের বড়াইগ্রামে গৃহবধূ শাহীনুর খাতুনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আসামী মতিউর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার বেলা এগারোটার দিকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক প্রেসবিফিংয়ে এই তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক যুবায়ের।

তিনি আরো জানান,পরকীয়ার জন্যে ঘৃণায় প্রতিশোধ থেকে এই হত্যাকান্ড ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ৩ জুন রাত দেড়টার দিকে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। ভিকটিমের ভাই নূর আলী ওরফে মোহাম্মদ আলী গত ৫ জুন বড়াইগ্রাম থানায় হাজির হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এজাহারে উল্লেখ করা হয় ২ জুন রাতে হত্যাকান্ডের শিকার তিন সন্তানের জননী গর্ভবতী শাহিনুর খাতুনের স্বামী রাশিদুল ইসলাম অভিযুক্ত হত্যাকারী মতিউরের স্ত্রী আছমা খাতুনকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এরই জেরে প্রতিশোধ নিতেই ৩ জুন রাত্রি দেড়টার দিকে মতিউর তার গরুর ঘাসকাটা হাসুয়া নিয়ে রাশেদের বাড়িতে যায় এবং চুপিচুপি শাহিনুর খাতুনের ঘরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত অবস্থায় ৯ মাসের গর্ভবতী শাহিনুর খাতুনকে হাসুয়া দিয়ে জবাই করে। শাহিনুরের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তার ২ পায়ের মাংস কেটে দেয়।

তদন্তে মতিউরের সম্পৃক্ততা পেয়ে তদন্তকালে প্রাপ্ত তথ্যাদি ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহভাজন মতিউর রহমানকে তার নিজ বাড়ি উপজেলার ভবানীপুর গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়।

তিনি আরো জানান, হত্যাকান্ডের শিকার শাহিনুর খাতুন (৩২) এর আনুমানিক ১৮ বছর পূর্বে উপজেলার ভবানীপুর কারিগরপাড়া এলাকার মৃত মজির উদ্দিনের ছেলে রাশিদুল ইসলামের বিয়ে হয় । বিয়ের পর শাহিনুর খাতুনের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে জন্ম গ্রহণ করে এবং ০৯ মাসের গর্ভবতী ছিল। বিয়ের পর থেকেই শাহিনুর খাতুননের স্বামী রাশিদুল ইসলাম এর সাথে বনিবনা হতো না। শাহিনুর খাতুননের গর্ভে ৯ মাসের সন্তান রেখেই গত ৩১ মে তার স্বামী প্রতিবেশী মতিউর রহমান এর স্ত্রী আছমা খাতুনকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। বিষয়টি জানার পর শাহিনুর খাতুনের বাবার বাড়ির লোকজন রাশিদুলকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় ২ জুন রাত আটটার দিকে শাহিনুর খাতুন তার ১ বছরের ছেলে সামিউলকে নিয়ে তার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। পরে শাহিনুরের স্বামী রাশিদুল ইসলাম অজ্ঞাত একটি মোবাইল নম্বর হতে শাহিনুর খাতুনের ভাই নূর আলী বাবাকে ফোন করে জানায় কে বা কাহারা শাহিনুরকে তার শয়ন ঘরের বিছানার উপর জবাই করে রেখে গেছে। এ সংবাদ পাওয়ার পর শাহিনুর খাতুনের বাবার চিৎকার করে কান্না শুরু করলে শাহিনুর খাতুনের ভাই নূর আলী ওরফে মোহাম্মদ আলী ঘুম থেকে জাগা পেয়ে তার বাবার কাছে যায়। বাবার মুখ থেকে শুনে সে নিজেই তার বোন জামাইয়ের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করলে সে জানায় তার বোনকে কে বা কারা তার শয়ন ঘরের বিছানার উপর জবাই করে রেখে গেছে। ফোনে সে কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় সে পাবনার ঈশ্বরর্দীতে আছে। ঘটনাটি শুনার পর পরই তারা দ্রুত তার বোন জামাইয়ের বাড়ি গিয়ে দেখে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়েছে।

এ সংক্রান্তে ভিকটিমের ভাই নূর আলী গত ৫ জুন বড়াইগ্রাম থানায় হাজির হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে এজাহার দাখিল করলে তার সূত্র ধরে মামলা রুজু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ ঘটনাস্থল ও তার আশপাশে ব্যাপক তদন্ত শুরু করে। ঘটনার সাথে শাহীনুরের স্বামী রাশেদুলকে পাবনার ঈশ্বরদী হতে এবং তার পরকীয়া প্রেমিকাকে আসমা খাতুনকে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা এবং গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে গাজীপুর হতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। তদন্তকালে প্রাপ্ত তথ্যাদি ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অত্র হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত অপর সন্দেহঝাজন ভবানীপুর গ্রামের আকবর আলীর ছেলে মতিউর রহমানকে তার নিজ বাড়ি হতে আটক করা হয়।

আটককৃত সন্দেহভাজন মতিউরকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায় যে, রাশেদের প্রতিবেশী মতিউর রহমান এর স্ত্রী আসমা খাতুন এর সাথে রাশেদের পরকীয়া সম্পর্ক চলছিল। বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার এলাকায় সালিশ-দরবার হয়। কিন্তু রাশেদ-আসমার অবৈধ প্রেম থেমে থাকেনি। অভিযুক্ত মতিউর শারীরিকভাবে অসুস্থ ও হাঁপানি রোগী। গত ৩১মে রাশেদ আসমাকে নিয়ে ঢাকা পালিয়ে যায়। এতে মতিউর আরও রেগে যায় রাশেদের ওপর এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় খুঁজতে থাকে। ২জুন রাশেদের মা ছেলে রশিদ, ছেলের বৌ ও নাতনী পার্শ্ববর্তী গ্রামে কবিগান শুনতে যায়। রাশেদের স্ত্রী শাহিনুর খাতুন তার ১ বছরের ছেলে সন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ে। বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে মতিউর তার গরুর ঘাসকাটা হাসুয়া নিয়ে রাশেদের বাড়িতে যায় এবং চুপিচুপি শাহিনুর খাতুনের ঘরে প্রবেশ করে। ঘুমন্ত অবস্থায় শাহিনুর খাতুনের গলায় হাসুয়া দিয়ে কেটে দেয়। শাহিনুরের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তার ২ পায়ের মাংস কেটে দেয়। পরদিন হাসুয়াটি বাড়ির পার্শ্ববর্তী বড়াল খালের ঝোপে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে মতিউর রহমানের দেখানো মতে পুলিশ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে উক্ত হাসুয়াটি উদ্ধার করে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে