‘বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনের অসমাপ্ত কাজ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’

0
203
‘বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনের অসমাপ্ত কাজ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার

মূল প্রবন্ধ

তারিখ: ৩০ আগষ্ট ২০২১ রোজ: সোমবার

স্থান: বড়াইগ্রাম প্রেসক্লাব

উপস্থাপনায়: মোঃ মাহমুদুল হক খোকন

ভুমিকা: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন উপজেলা বড়াইগ্রাম। ইংরেজ আমলে ১৮৬৯ সালের ১২ মার্চ ভারত উপমহাদেশের অবিভক্ত বাংলার একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে এই থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এক সময় গুরুদাসপুর থানাও বড়াইগ্রাম থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯১৭ সালে বড়াইগ্রাম থানার একাংশ নিয়ে গুরুদাসপুর থানা গঠিত হয়। তবে সরকারী ওয়েবসাইট ‘জাতীয় তথ্য বাতায়নে’ বড়াইগ্রাম থানা হিসেবে ২৯-০৫-১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নির্দশনে ভরপুর এই থানা মোগল, পাঠান, ইংরেজ শাসনামলের অনেক স্মৃতিচিহ্ন বুকে ধারণ করে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোয়ারী গ্রামে প্রাচীন কালের বিশী জমিদারদের শুলদÐ, তিরাইলে বিশীদের তীরন্দাজ, সাঁতৈল রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও জোড়াদীঘি, আহম্মেদপুর নবাবী আমলের ছোট্ট মসজিদ, বাগডোব ও দ্বারিকুশির প্রাচীন জমিদার বাড়ি ও শিব মন্দির এখনও যেন সেই গৌরব আর ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এক সময় এই থানা রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমার অন্তর্গত ছিল। কালের পরিক্রমায় বড়াইগ্রাম এখন নাটোর জেলার সাতটি উপজেলার একটি উপজেলা। ১৯৮৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে বড়াইগ্রাম থানাকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ফিরে দেখা ইতিহাস, যে আগুনে পুড়ল কপাল : পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তৎকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক থানা সদরে দুটি করে অফিস থাকত। একটি হলো সার্কেল অফিস (উন্নয়ন) বা CO (Dev) এবং অপরটি হলো সার্কেল অফিস (CO (Rev)। এ দুটি অফিসের মাধ্যমেই থানা পর্যায়ের প্রশাসনিক এবং রাজস¦ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। এ দুটি অফিসের দায়িত্বে থাকতেন দুইজন অফিসার। বড়াইগ্রাম থানায় এই দুটি অফিস ছিলো লক্ষ¥ীকোল বাজারে। এখানে বসে তারা অফিস করতেন। সে সময় বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম আফতাব সরকার। ১৯৬৪-৬৫ সালের কথা। বড়াইগ্রামের ভাগ্যাকাশে হঠাৎ ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ দেখা দিলো, একদল ষড়যন্ত্রকারী নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার খায়েসে ষড়যন্ত্রের নীল নকশায় পা দিলো। ভ‚লুন্ঠিত করলো বড়াইগ্রামের স্বার্থ। রাতের অন্ধকারে একদল দুষ্কৃতিকারী সার্কেল অফিসে আগুন লাগিয়ে দিলো। পুরে ছাই হলো অফিস ঘরটি। ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। এই মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসডিও সাহেব ও ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে অফিস দুটি বড়াইগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো বনপাড়ায়। সেই যে বিপর্যয় শুরু হলো আজও তার শেষ হয়নি। সেই অভিশপ্ত আগুনে শুধু ঘরই পুড়েনি, পুড়েছে এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, সাধ, আশা আকাঙ্খা । হিরোশিমা-নাগাসাকির নাপাম বোমার মত এখনও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে বংশ পরম্পরায় এই অঞ্চলের আবালবৃদ্ধবনিতা।

নামেই বড়াইগ্রাম, কার্যক্রম সব বনপাড়া: উপজেলার নাম বড়াইগ্রাম কিন্ত অফিস আদালত, কার্যক্রম সব বনপাড়ায়। বড়াইগ্রামে থাকার মধ্যে আছে থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব রেজিষ্ট্রি অফিস ও সার্কেল অফিস বা সহঃ পুলিশ সুপারের কার্যালয়। উপজেলা পরিষদসহ সব অফিস আদালত বনপাড়ায় অবস্থিত। উপজেলা সদর হওয়ার কারণে সব প্রতিষ্ঠান সেখানে কেন্দ্রীভুত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে থানা, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, ভুমি অফিস, ব্যাংক-বীমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মার্কেট, বিপনী বিতান, ব্যবসা বাণিজ্য সব কিছুই একতরফা ভাবে সেখানে গড়ে উঠেছে। সরকারি বেসরকারি উদ্যোক্তারা বনপাড়াকেই বেছে নিচ্ছে তাদের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও বিনিয়োগ করার জন্য। ছোট-খাট যেকোন দাপ্তরিক কাজে উপজেলার বিভিন্ন দ‚রদ‚রান্ত প্রান্ত থেকে যেতে হয় বনপাড়ায়। যার ফলে সময়, শ্রম, বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় সাধারণ মানুষদের। নানাবিধ বিড়ম্বনারও মুখোমুখি হতে হয় অনেক সময়।

বৈষম্য চোখে পড়ার মত: উপজেলা পরিষদ গঠন হওয়ার পর থেকে বনপাড়া ও বড়াইগ্রামের অবকাঠামোগত ও সার্বিক উন্নয়নের আকাশ-পাতাল যে বৈষম্য তা সহজেই চোখে পড়ে। উপজেলা কমপ্লেক্সসহ সকল অফিস আদালত বনপাড়ায় হওয়াতে সেখানে সব কিছু গড়ে উঠেছে। ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প প্রতিষ্ঠান সবই সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পক্ষান্তরে বড়াইগ্রাম দিনের পর দিন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে ভীষণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এখানে না হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না হয়েছে সরকারি অফিস আদালত , না গড়ে উঠেছে ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। থানা সদর হওয়ার পরও যে নুন্যতম উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, সেটিও হয়ে উঠেনি। বেকার যুবকদের জন্য নেই কোন কর্মসংস্থানের মত শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা কেন্দ্র। নেই কোন বিনোদনম‚লক প্রতিষ্ঠান। জনশ্রæতি আছে এখানে যে হাতে গোনা দু’একটি প্রতিষ্ঠান এখনও দৃশ্যমানহয় সেগুলোও বিভিন্ন সময় বড়াইগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়ার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্ত এখানকার ছাত্র জনতার প্রতিরোধের মুখে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে বড়াইগ্রাম বলতে বোঝায় একটা অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত ,অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ একটা জনপদের নাম।

মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন: বড়াইগ্রাম থেকে উপজেলা পরিষদ ও অন্যন্য অফিস আদালত বনপাড়ায় চলে যাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের মানুষেরা নিজেদের অসহায় ও বঞ্চিত ভাবতে থাকে। তারা মনে করে এর মাধ্যমে তাদেরকে সব দিক থেকে ঠকানো হয়েছে। ফলে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে তারা ভীষণ হীনমন্যতায় ভোগে। তাদের মধ্যে সবসময় Inferiority Complex কাজ করে। পক্ষান্তরে বড়াইগ্রাম থানার পশ্চিমাংশের মানুষেরা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতে থাকে। সামাজিক,অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সবদিক থেকে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে Superiority Complex কাজ করে। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অবলীলায় একটা মনস্তাত্তি¡ক বিভাজন তৈরী হয়েছে । যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এই মনস্তাত্তি¡ক বিভাজন নিরসনের জন্য দরকার দুই অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন । যা একমাত্র দুটি পৃথক উপজেলা গঠনের মাধ্যমেই সম্ভব, অন্য কোন ভাবে নয়।

আশা ও স্বপ্ন ভঙ্গের প্রতিশ্রুতি: একে একে সব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বনপাড়াতে চলে যাওয়াতে এ অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাদের এ ক্ষোভ ও হতাশা বোধ থেকে তারা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করে। বিভিন্ন সভা সমাবেশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এটি তুলে ধরে ‘বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা’ গঠনের তারা দাবি জানায়। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের সময় এই দাবিটি বেশি আলোচিত হয়। প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিটি সরকারের আমলে এই দাবীটি নিয়ে কথাবার্তা, আলোচনা চলে আসছে। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি সবার কাছেই এই উপজেলা ভাগের বিষয়টি দাবি আকারে পেশ করা হয়েছে। অনেক সময় প্রতিশ্রæতিও পাওয়া গেছে। কিন্ত নানাবিধ কারণে তা শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এক ধরনের হতাশা ও গøানি এখানকার মানুষের মধ্যে সবসময় কাজ করে।

প্রতিবন্ধকতা: বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে যেটি প্রথমে ফুটে উঠে তা হচ্ছে এখানে ইউনিয়নের স্বল্পতা। বড়াইগ্রাম উপজেলায় ইউনিয়নের সংখ্যা ৭ টি। পৌরসভা দু’টি। সাধারণত একটি উপজেলা করতে কমপক্ষে ৫-৬টি ইউনিয়ন দরকার হয়। যদিও ৪টি ইউনিয়ন নিয়েও অনেক উপজেলার দৃষ্টান্ত আছে। তবে ইউনিয়নের সংখ্যা যদি ১০-১১টি হতো তাহলে এটি আমাদের জন্য তুলনাম‚লক সহজ হতো। তবে এক্ষেত্রে আমাদের যেটা করতে হবে তা হচ্ছে বড় ইউনিয়নগুলো ভেঙ্গে ২-৩টি নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করতে হবে। এজন্য উপজেলা ভাগের কাজের অংশ হিসেবে প্রথমে কয়েকটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের স‚চনা করতে হবে। অবশ্য আমাদের উপজেলায় দুটি পৌরসভা থাকায় উপজেলা ভাগের দাবীটির একটা যৌক্তিকতা পাবে। যা আমাদের জন্য কিছুটা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া উপজেলা ভাগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বড়াইগ্রামে একটি সাব রেজিষ্ট্রার অফিস স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের অন্যকোন উপজেলায় দুটি সাব রেজিষ্ট্রার অফিস আছে বলে আমাদের জানা নেই। বড়াইগ্রাম পৌরসভাও করা হয়েছিল এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই। বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক উপজেলাতে দুটি পৌরসভা আছে।

আবার কেউ কেউ বলে থাকে যে ‘এখন রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। দুরত্ব কোন ব্যাপার নয়। কাজেই উপজেলা ভাগের আর দরকার নাই। ছোট উপজেলা এটা আবার ভাঙ্গার দরকার কি, ভাঙলে আরো ছোট হয়ে যাবে। সরকার করবে না, এটা করা অনেক কঠিন’ ইত্যদি ইত্যদি অনেক কথা বলে। কেউ কেউ বলে ‘আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে, আদৌ হবে কি না। অযথা এর পিছনে সময় দিয়ে লাভ নেই’। কেউ হতাশা ব্যক্ত করে বলে ‘ক্ষমতাসীনরা চায় না বড়াইগ্রাম আলাদা উপজেলা হোক। দু’দিন পর এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না’। এরকম হাজার নেগেটিভ কথা। তবে এগুলো ভাবা অস্বাভাবিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে এরকম মনে হতে পারে। সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ আছে। একেক জনের চিন্তা চেতনা, মনোভাব একেক রকম। এরকম সমালোচনা, বাধা বিপত্তি আসবেই। তবে একটা সহজ কথা সবার জানা থাকা দরকার। মনে রাখবেন যদি কোন কাজের পেছনে ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকা যায় তবে প্রকৃতির নিয়মেই সেই কাজের সফলতা আসবেই আসবে। আপাত দৃষ্টিতে এ কাজ কঠিন মনে হতে পারে। শুরু করুন, লেগে থাকুন, নিঃস্বার্থভাবে কাজ করুন ফলাফল আপনার হাতে আসতে বাধ্য। বেশি দ‚রে যেতে হবে না , আমাদের পাশের নলডাঙ্গা উপজেলার সফলতার গল্পটি শুনলেই বুঝতে পারবেন কিভাবে তারা লেগে থেকে এই উপজেলা ভাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের পাশের চলনবিলের সলঙ্গা থানাকে উপজেলা করার প্রক্রিয়া তারা গত বছর থেকে শুরু করেছেন। কোন এক সময় হঠাৎ শুনতে পাব সেটি উপজেলা হিসাবে সরকার ঘোষণা করেছে।

বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা , আন্দোলন ও দাবি দাওয়া: বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনের বিষয়ে বিগত ৩০-৩৫ বছর ধরে কমবেশি আলাপ আলোচনা, দাবি দাওয়া অব্যাহত আছে। কিন্ত ধারাবাহিক বা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কোন আন্দোলন, পেপার ওয়ার্ক ও দাপ্তরিক যোগাযোগ করা হয়নি। যা হয়েছে সেটা বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক ভাবে করা হয়েছে। তৃণম‚ল থেকে সচিবালয় পর্যন্ত যে ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ এবং সরকারের উর্দ্ধতন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে যে নিবিড় যোগাযোগ দরকার ছিল তা একেবারেই করা হয়নি। না এটা ব্যক্তিগতভাবে হয়েছে না এটা সাংগঠনিক ভাবে হয়েছে। যার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এটা থেকে কোন ফল পাওয়া যায়নি।১৯৮৭/৮৮ সালের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং নিকারের সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ বনপাড়ায় এসেছিলেন। তখন সেখানে উপজেলা ভাগের বিষয়টি বড়াইগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। নিকারের সভাপতি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এর কোন ফলাফল আমরা দেখতে পাইনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ যেবার নাটোরে এসেছিলেন সেবার মহাজোটের পক্ষ থেকে উপজেলা ভাগের বিষয়টি জনসভায় তুলে ধরার জন্য তৎকালীন নাটোর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অন্যন্য নেতৃবৃন্দের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে জনসভায় বক্তৃতার সময় বিষয়টি কেউ উত্থাপন করেননি। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরার সহজ সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।

সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভেদ,অনৈক্য: বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনের উদ্যোগ এখনও আলোর মুখ না দেখার আরেকটি প্রধান কারণ এখানকার মানুষেরা নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভীষণ ভাবে উদাসীন। তাদের এই উদাসীনতার সুযোগে অন্যেরা তাদেরকে যুগের পর যুগ বোকা বানিয়ে এবং সাময়িক লোভ লালসা দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। নিজেদের পকেট ভারী করেছে। বড়াইগ্রামবাসী তাদের এই নায্য দাবী আদায়ের ব্যাপারে কখনও সেভাবে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন, সমাবেশ, মানব বন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও অনশনের মত শান্তিপ‚র্ণ কর্মস‚চী পালন করতে পারেনি। বড়াইগ্রামে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আছে তারাও সু সংগঠিত ভাবে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। অথচ এখানে দল, মত, শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সব মানুষের ইস্পাত কঠিন ঐক্যবদ্ধতা খুব দরকার ছিল। এখানে সব ধরনের ব্যক্তিস্বার্থ, সংকীর্ণতা, পদ পদবি, লোভ লালসা ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলের এক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের ভয় ভীতির উর্দ্ধে উঠে এই দাবীর বিষয়ে

মুখ খুলতে হবে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এই দাবি আদায়ের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য। মনে রাখতে হবে আমাদের বড়াইগ্রামের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বড়াইগ্রামের অধিকার আদায় করে নিতে হবে।

এক নজরে বড়াইগ্রাম উপজেলা:

*   আয়তন       – ২৯৯.৬১ বর্গ কিলোমিটার

*   জনসংখ্যা      -২,৯৪,৭২৩ জন, (পুরুষ- ১,৫৩,১৫৩ জন, মহিলা-১,৪১,৫৭০ জন )

*   ঘনত্ব        -৮২০ জন প্রতি বর্গ কিলোমিটার

*   নির্বাচনী এলাকা  -৬১-নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর)

*   ইউনিয়ন       -০৭টি (সাত)

*   মৌজা        -১৫২টি

*   পৌরসভা      -২টি

* ইউনিয়ন ভিত্তিক গ্রাম, আয়তন ও লোকসংখ্যা:

১. জোয়ারী ইউনিয়ন:     মোট গ্রাম: ২১টি               আয়তন: ৩৯ বর্গ কি:মি:                                লোক সংখ্যা: ৩৬,০০০

২. বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন: মোট গ্রাম: ৩৪টি                              আয়তন: ৩৩ বর্গ কি:মি:                                লোক সংখ্যা: ৪৫,০০০

৩. জোনাইল ইউনিয়ন:  মোট গ্রাম: ১৬টি                               আয়তন: ২৯.৯৯ বর্গ কি:মি:        লোক সংখ্যা: ৪৩,৯৬২

৪. নগর ইউনিয়ন:            মোট গ্রাম: ৪২টি                               আয়তন: ৪৩.৯৮ বর্গ কি:মি:        লোক সংখ্যা: ৪৩,৪৫৪

৫. মাঝগাঁও ইউনিয়ন:    মোট গ্রাম: ২১টি                               আয়তন: ১৮.২০ বর্গ কি:মি:         লোক সংখ্যা: ৩৫,৯৭৬

৬. গোপালপুর ইউনিয়ন:              মোট গ্রাম: ১৪টি                               আয়তন: ৭,০৩৮ একর                  লোক সংখ্যা: ৩২,৪০৫

৭. চান্দাই ইউনিয়ন:        মোট গ্রাম: ১৭টি                               আয়তন: ৪৫ বর্গ কি:মি:                                লোক সংখ্যা: ২৫,৫৮৭

* পৌরসভা ভিত্তিক মহল্লা /গ্রাম, আয়তন ও লোকসংখ্যা:

১. বড়াইগ্রাম পৌরসভা: মহল্লা/গ্রাম: ১৩টি             আয়তন: ১১.৮৪বর্গ কি:মি: লোকসংখ্যা: ২৪,২৯৯

২. বনপাড়া পৌরসভা: মহল্লা/গ্রাম: ০৯টি            আয়তন: ৬.৯২বর্গ কি:মি:                            লোকসংখ্যা: ২২,৮৬৭

প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (National Implementation Committee for Administrative Reorganization-Reform) (NICAR) পরিচিতি:

প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কারের জন্য গঠিত একটি কমিটি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির বর্তমান আহ্বায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গঠনের ইতিহাস: সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে বেসামরিক প্রশাসন কাঠামো ও সংগঠন পর্যালোচনা এবং ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রশাসনকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবার লক্ষ্যে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কার কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশক্রমে ১৯৮২ সালে ‘জাতীয় প্রশাসন পুনর্গঠন-সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে নতুন একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান একই বছরের আগস্টে এ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গঠিত এ কমিটিতে অর্থ ও পরিকল্পনা, আইন ও আইন-সংস্কার এবং কৃষিমন্ত্রীসহ আরো ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের মুখ্য স্টাফ অফিসার।

পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মাহবুব আলী খান সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময়েই কমিটি বাংলাদেশের থানাসম‚হকে উপজেলায় ও মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে এবং বেশ কিছু নতুন জেলা গঠন করে। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনাকে আহ্বায়ক করে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ২৫ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়।

নিকার বর্তমান (NICAR) কমিটি: (সংযুক্তি)

সর্বশেষ যে তিনটি নতুন উপজেলা গঠিত হলো:

(১) ঈদগাঁও উপজেলা

প্রতিষ্ঠাকালঃ ২৬ জুলাই, ২০২১

আয়তনঃ ১১৯.৬৬ বর্গকিমি (৪৬.২০ বর্গমাইল)

জনসংখ্যাঃ ১,২৪,৭৯৪

অবস্থান ও আয়তন: ঈদগাঁও উপজেলা কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত। এটির আয়তন ১১৯.৬৬ বর্গকিলোমিটার বা ৪৬.২০ বর্গমাইল।

নামকরণ ও ইতিহাস: ২২ জুলাই ২০১৯ ঈদগাঁওকে উপজেলা ঘোষণার জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২৬ জুলাই ২০২১ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় ঈদগাঁওকে স্বতন্ত্র উপজেলা হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। প‚র্বে এটি কক্সবাজার সদর উপজেলার আওতাধীন ছিলো। ঈদগাঁও থানা ও ইউনিয়নের সাথে মিল রেখে উপজেলার নামকরণ করা হয়।

প্রশাসনিক এলাকা: কক্সবাজার জেলার ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি গঠিত হয়। অত্র উপজেলা ঈদগাঁও থানার আওতাধীন।

ইউনিয়নসমূহ: ১. ইসলামপুর ২. পোকখালী ৩. ইসলামাবাদ ৪. ঈদগাঁও ৫. জালালাবাদ

(২) ডাসার উপজেলা

প্রতিষ্ঠাকাল: ২৬ জুলাই ২০২১

সংসদীয় আসন: মাদারীপুর-৩

আয়তন : ৭৬.৮ বর্গ কি: মি: (২৯.৭ বর্গমাইল)

জনসংখ্যা : (২০১১): ৭১, ৪৯৪

ডাসার উপজেলা বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। বালিগ্রাম, কাজীবাকাই, গোপালপুর, ডাসার ও গোপালপুর এই পাঁচ ইউনিয়ন নিয়ে ডাসার উপজেলা গঠিত। এই উপজেলার আয়তন ৭৬ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ডাসারের জনসংখ্যা ৭১,৪৯৪।

ডাসার থানা

২০১২ সালের ২ ফেব্রæয়ারি ডাসারে একটি পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপিত হয়। পরে কালকিনি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে ২০১৩ সালের ২ মার্চ ডাসার থানা গঠন করা হয়। এর কিছুদিন পর থেকেই ডাসারকে উপজেলায় রূপান্তরের প্রস্তাব দেয় স্থানীয় প্রশাসন। ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে ডাসার থানাকে উপজেলায় উন্নীতকরণের কথা থাকলেও তা নাকচ করা হয় ও বিষয়টি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২৬ জুলাই নিকারের ১১৭তম সভায় ডাসারকে পরিপ‚র্ণ উপজেলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

ডাসার উপজেলা ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এবং এই উপজেলায় ৬৭টি মৌজা রয়েছে।

ইউনিয়নসমূহ

১.  গোপালপুর ইউনিয়ন ২. কাজীবাকাই ইউনিয়ন ৩. বালিগ্রাম ইউনিয়ন ৪. ডাসার ইউনিয়ন ৫. নবগ্রাম ইউনিয়ন

ডাসার উপজেলার মোট আয়তন ৭৬.০৮ বর্গ কিলোমিটার।

(৩) মধ্যনগর উপজেলা

প্রতিষ্ঠা কাল: ২৬ জুলাই ২০২১

সংসদীয় আসন:  ২২৪

আয়তন:  ২২১ বর্গকিমি (৮৫ বর্গমাইল)

অবস্থান ও লোকসংখ্যা : মধ্যনগর উপজেলা বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। এর লোক সংখ্যা প্রায় ১,৫০,০০০

মধ্যনগর থানা

১৯৭৪ সালে মধ্যনগর ইউনিয়ন, চামরদানী ইউনিয়ন, বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন ও বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন নিয়ে মধ্যনগর থানা গঠিত হয়। থানার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন থেকে উপজেলা সদরের দ‚রত্ব ৪০ কিলোমিটারের বেশি, অপরদিকে উপজেলা সদর থেকে মধ্যনগরের দ‚রত্ব ২০ কিলোমিটার। যার ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসনিক সেবা নিতে মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছিলো। ২০০১ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ৮৬তম বৈঠকে মধ্যনগর থানা এলাকার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে মধ্যনগর উপজেলা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে নিকারের ৮৮তম সভায় এ সিদ্ধান্তটি বাতিল করা হয়েছিল।সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৬ জুলাই নিকারের ১১৭তম সভায় মধ্যনগরকে পরিপ‚র্ণ উপজেলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

ধর্মপাশা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম মধ্যনগর থানার আওতাধীন।

ইউনিয়নসম‚হ

১.  বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন ২. বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন ৩. চামরদানী ইউনিয়ন ৪. মধ্যনগর ইউনিয়ন

রূপরেখা তৈরি ও মিশন ভিশন স্থির: বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনকল্পে আগামী ৫ বছর ব্যাপী একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। স্থির করতে হবে এর মিশন ভিশন। তার আলোকে এই উপজেলা ভাগ আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। সম্পৃক্ত করতে হবে অত্র এলাকার সর্ব শ্রেণী, পেশার মানুষকে।

করণীয় ও সুপারিশ:

শুধু আবেগ দিয়ে নয় বড়াইগ্রাম-বনপাড়া পৃথক উপজেলা গঠনকল্পে আমাদের বেশ কিছু বাস্তবধর্মী ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপ‚র্ণ আন্দোলন, পেপার ওয়ার্ক, দাপ্তরিক কাজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এই কাজ এগিয়ে নিতে হবে। প্রতি বছরই কিন্তু একটি, দু’টি, তিনটি করে নতুন উপজেলা গঠন হচ্ছে। তাদের কর্মপ্রণালী আমরা দেখে নিতে পারি। নলডাঙ্গা উপজেলার এই কাজে যে  সব ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট ছিল তাদের সাথে দেখা করে তাদের কাগজপত্রগুলো আমরা নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করতে পারি। নিম্নে আরো কিছু সুপারিশ ও করণীয় বিষয় তুলে ধরা হলো:

১. প্রথমে দুটি সমন্বয় কমিটি করতে হবে। একটি হবে বড়াইগ্রামকেন্দ্রিক । অপরটি হবে ঢাকা কেন্দ্রিক। স্থানীয় এবং জাতীয় ভাবে এই দুটি কমিটি কাজ করবে।

২. নিকার (ঘওঈঅজ ) বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যদের সাথে ধারাবাহিক সাক্ষাত ও মতবিনিময়। তাদের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া।

৩. নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপুর্ণ আন্দোলন যেমন সমাবেশ, মানব বন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও অনশনের মত কর্মস‚চী হাতে নিতে হবে। (স্বাস্থ্য বিধি মেনে)

৪. স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সাথে মতবিনিময় ও স্মারকলিপি প্রদান। তাদের সহযোগিতা কামনা করা।

৫. উপজেলা ভাগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে জনমত গঠন কল্পে নাটোর জেলা প্রেসক্লাব, ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন।

৬. ইউনিয়ন ভাগের জন্য কার্যক্রম আগে শুরু করা।

৭. গণ স্বাক্ষর ও গণ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিটি গ্রামে, ওয়ার্ডে, ইউনিয়নে আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন করা।

৮. জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানব বন্ধন ।

৯. প্রতি দুই মাস বা তিন মাস পরপর সমন্বয় কমিটির মিটিং করতে হবে। কাজের অগ্রগতি ও ফলাফল পর্যালোচনা করতে হবে।

১০. কমিটির কার্যক্রম সুচারু রুপে সম্পন্ন করার জন্য বাৎসরিক ক্যালেÐার তৈরি করতে হবে। কোন মাসে কি কি কর্মস‚চী থাকবে সেটা প‚র্ব থেকেই নির্ধারিত থাকবে।

১১. উপজেলা বিভক্তির এই আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি ফান্ড বা তহবিল তৈরি করতে হবে। সামর্থ অনুযায়ী সকলকে এই ফান্ডে ডোনেশান করতে হবে।

১২. প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের এলাকার বা পরিচিত যারা আছেন তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করা। তাদের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ করা।

১৩. ব্যক্তিস্বার্থ, পদ পদবি, সাময়িক লোভ-লালসা ও সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে নিবেদিতপ্রাণ ভাবে কমিটির সদস্যদের কাজ করতে হবে । বড়াইগ্রামের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

১৪. সিনিয়র ও বয়োজ্যেষ্ঠদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যেতে পারে।

১৫. বনপাড়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাথে ধারাবাহিক ভাবে মত বিনিময় করা যেতে পারে। তাদের সহযোগিতা ও পরামর্শ গ্রহণ করা। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা যে এতে বনপাড়ার কোন ক্ষতি হবেনা বা বনপাড়ার গুরুত্বও কমবেনা। বরং বনপাড়া যদি একটা প‚র্ণাঙ্গ উপজেলা হয় তাহলে সেখানেও হাসপাতাল, থানাসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। কেউ যেন কোন প্রতিবন্ধকতা ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা না চালায়। আমরা আন্তরিক ভাবেই বড়াইগ্রাম এবং বনপাড়ার সুষম ও কাঙ্খিত উন্নয়ন চাই।

১৬. আগের যদি কোন কাগজপত্র বা ফাইল থাকে সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

১৭. ফেসবুক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পত্রপপত্রিকায় এটার উপর লেখালেখি অব্যাহত রাখতে হবে। চায়ের স্টল, হাট বাজার, মাঠে ময়দানে, নানাবিধ আচার অনুষ্ঠানে, স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজেলা ভাগের বিষয়টি নিয়ে বড়াইগ্রামের সর্ব শ্রেণির মানুষ তথা আবালবৃদ্ধবনিতার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। লিফলেট, পোষ্টারিং, দেয়াল লিখন, ব্যানার, ফেষ্টুনে ছেয়ে ফেলতে হবে এলাকার প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি এলাকা। বজ্রকন্ঠে শ্লোগান তুলতে হবে, “এক দফা এক দাবি, উপজেলা চায় বড়াইগ্রামবাসী”।

শেষ কথা: বড়াইগ্রাম আমাদের জন্মভ‚মি, আমাদের ঠিকানা। এখানে আমাদের নাড়ী পোঁতা, এখানে আমাদের শেকড় গ্রথিত। আমাদের নিজেদের অনৈক্য, বিবাদ বিভাজনের কারণে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই জনপদটি এখনো রয়ে গেছে পশ্চাৎপদ। কোন কাঙ্খিত উন্নয়নই এই অঞ্চলের এখনও হয়নি। অথচ এটি ছিল একটি সম্ভবনাময় জায়গা। বিগত ৩০-৩৫ বছর ধরে এই উপজেলা ভাগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু কোন ফলাফল নেই। অথচ বাংলাদেশের অনেক জায়গায় যথাযথ শর্ত প‚রণ না করেও অনেক নতুন উপজেলার সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে আরো হবে। যারা করেছে তারা হয়তো নিয়মতান্ত্রিকভাবে লেগে থেকে কাজটি করে নিয়েছে। আর আমরা এখানে আছি বৃহৎ স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার ব্যস্ততায়। আমাদের অজুহাতের শেষ নেই, দল মত শ্রেণি পেশার উর্দ্ধে উঠে কোন কাজ করার সাহস, ইচ্ছে কোনটিই আমাদের নেই। শুধু ভাবি যে ‘যদি পাছে লোকে কিছু বলে’। ‘যদি আমি কারো বিরাগভাজন হই। যদি আমার ক্রেডিট অন্য কেউ নিয়ে নেয়। এটা হলে আমার কি লাভ বা আমি কি পাব’ ইত্যদি ইত্যদি নানা চিন্তা আমাদের আড়ষ্ট করে রাখে। এজন্য এলাকার জন্য কিছু করতে গেলে আমরা এক পা আগাই দুই পা পিছাই। এই চক্রের মধ্যেই আমারা ৩০/৩৫ বছর ধরে ঘ‚র্ণাকারে ঘ‚রছি। এর কি শেষ হবে না। আমাদের ঘ‚রে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আসুন আমরা ভবিষৎ প্রজন্মের স্বার্থে সব বিভেদ, অনৈক্য দ‚র করে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত, অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ এ জনপদটিকে একটি সমৃদ্ধ, আদর্শ ও মডেল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। ধন্যবাদ।

মোঃ মাহমুদুল হক খোকন

সম্পাদক ও প্রকাশক

সাপ্তাহিক চলনবিল প্রবাহ

সদস্য সচিব

বড়াইগ্রাম নাগরিক কমিটি

০১৭১২-৭৫৬৭৫৮

khokanhaque.du@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে