ভাষাসৈনিক আলী তাহেরের শেষ চাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ

0
79

কুমিল্লার কৃতী সন্তান ভাষাসৈনিক আলী তাহের মজুমদারের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। শতোর্ধ বয়সী এ ভাষাসৈনিকের এখনও মেলেনি রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি। আর্থিক অসচ্ছল এ ভাষানিকের দিন কাটে অনেকটা দারিদ্র্যতার সঙ্গে সংগ্রাম করে।

কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামে ১৯১৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্ম এ সৈনিকের। বাবা মরহুম মো. চারু মজুমদার ও মা সাবানী বিবি। বাঙালির ভাষা আন্দোলন আর বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনবাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন এ বীর।

জীবন সায়াহ্নে এসে এখন তার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎই তার এ মুহূর্তের চাওয়া।

এদিকে ভাষাসৈনিক আলী তাহের মজুমদারকে ভাষার মাস এলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার জন্য সাময়িক ডাকাডাকি করেন। আর ভাষার মাস চলে গেলে তিনি থাকেন খবরের অন্তরালে।

জানা যায়, আলী তাহের মজুমদার ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৫ সালে কংগ্রেস রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৮ম পাঞ্জাব এমটি আর্মিতে কলকাতায় যোগদান করেন। তখন ৭-৮ মাস আর্মির প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ছুটিতে আসেন।

ছুটি শেষে আর্মিতে যোগদান না করায় তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে মার্শালকোর্ট। তৎকালীন কৃষক লীগ নেতা আবদুল মালেক তাকে আর্মিতে না ফেরার অনুরোধ করলে তিনি ছুটি শেষে আর ফিরে যাননি। তৎসময় কুমিল্লার ডিসি অফিসের আবদুল মজিদ ও এসপি অফিসের মোজাফ্ফর আহমেদ ভূঁইয়া তাকে মার্শালকোর্টের বিচার থেকে বাঁচানোর জন্য ফেনীতে জাপানি বোমায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে পাঞ্জাবে লিখিত রিপোর্ট পাঠায়।

এর পর তিনি ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বরে নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদহীন্দের অনুচর হিসেবে ১২নং আমেরিকার বোমা স্কোয়াড্রন কোম্পানিতে চাকরিতে যোগদান করেন।

১৯৪৬ সালে ১০নং মির্জাপুর অ্যাস্টেটে একটি চা দোকানে আড্ডা দেয়ার সময় তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় হয়। তখন বঙ্গবন্ধু কিছু প্রগতিমনা ছাত্রদের নিয়ে ঢাকা চলে আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং তার মুখে প্রথম বাংলাভাষী এলাকা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার কথা শুনতে পান আলী তাহের।

তখন দেশভাগের সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর পরিকল্পিত বাংলা ভাষাভাষী এলাকা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের সমর্থনে বঙ্গবন্ধু কাজ করেন।

এ সময় বঙ্গবন্ধুর কথায় মুগ্ধ হয়ে আরএসপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন আলী তাহের। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে।

১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুমিল্লায় এসে আরএসপি কর্মীর সঙ্গে আলোচনাসভার আহ্বান করলে তিনি ওই আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে তিন বছর কারাবরণ করতে হয়েছে।

১৯৫৬ সালে কারামুক্ত হয়ে কুমিল্লা সদর থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার পরের বছর কুমিল্লা পদ্ধতির জনক আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞানী ও কুমিল্লা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমবায় আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে যথাসাধ্য ভূমিকা পালন করেন এবং যে প্রথম ৫টি সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তার মধ্যে আলী তাহেরের এলাকার চাঁদপুর যাত্রাপুর কৃষক সমবায় সমিতি অন্যতম।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা ঘোষণা দেয়ার পর এর সপক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কুমিল্লার হোমনা ও দাউদকান্দি ব্যতীত সব থানা ও ইউনিয়নে পথসভা ও জনসভার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলার পর থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এ বীর সেনানী।

দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে এত অবদান রাখার পরও জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন ভাষাসৈনিক আলী তাহের মজুমদার। বয়সের ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ এ ভাষাসৈনিক চান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে