যেভাবে অভিনেতা হয়ে উঠেন আব্দুল কাদের

0
138

অনলাইন ডেস্ক: নিজের অভিনয় দিয়ে সারা জীবন যিনি মানুষকে হাসিয়ে গেছেন, আনন্দ দিয়ে গেছেন- সেই অভিনেতা আব্দুল কাদেরই নীরব হয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ‘বদি’ থেকে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র ‘মামা’ সহ প্রতিটি চরিত্রেই নিজেকে অভিনয় গুণে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এই অভিনেতা। কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থেমে গেল তার জীবন। থেমে গেল তার অভিনয়ের যাত্রাও, যেটা তিনি শুরু করেছিলেন তিন দশকেরও বেশি সময় আগে। গতকাল সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আব্দুল কাদের। আব্দুল কাদের ১৯৫১ সালে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তার অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল। স্কুলে নাটক করতেন।

তখনই তার অভিনয়ের প্রশংসা করতেন সবাই। তবে সারাজীবন অভিনয় নিয়ে থাকবেন- এটা কখনও ভাবেননি। অভিনয়ের বাইরে ফুটবলও ভালো খেলতেন আব্দুল কাদের। সেই কিশোর বয়সে গোলকিপার হিসেবে খেলতে পছন্দ করতেন। আব্দুল কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন। এরপর তার কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। তিনি অর্থনীতিতে সিংগাইর কলেজ ও লৌহজং কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। তবে এরপর বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থায় এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরির পর ১৯৭৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ‘বাটা’তে চাকরি শুরু করেন। সেখানে ছিলেন প্রায় ৩৫ বছর। এদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার প্রথম নাটকে অভিনয় শুরু। ১৯৭২-৭৪ পর পর তিন বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মহসীন হল ছাত্র সংসদের নাট্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল কাদের। ১৯৭২ সালে আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন মহসীন হলের নাটক সেলিম আল দীন রচিত ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশিত ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’-এ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রযোজিত বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ জ্ঞানের অনুষ্ঠান ‘বলুন দেখি’-তে চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে পুরস্কার পাওয়া আব্দুল কাদের ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ডাকসু নাট্যচক্রের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সাল থেকে থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর সদস্য এবং চার বছর যুগ্ম সম্পাদকের ও ছয় বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সাল থেকে টেলিভিশন ও ১৯৭৩ সাল থেকে রেডিও নাটকে অভিনয় শুরু হয় তার। টেলিভিশনে আব্দুল কাদের অভিনীত প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এসো গল্পের দেশে’। আবদুল কাদের বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাট্যশিল্পী ও নাট্যকারদের একমাত্র সংগঠন টেলিভিশন নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার সংসদের (টেনাশিনাস) সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। থিয়েটারের প্রায় ৩০টি প্রযোজনার এক হাজারের বেশি প্রদর্শনীতে অভিনয় করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘এখনও ক্রীতদাস’, ‘তোমরাই’, ‘স্পর্ধা’, ‘দুই বোন’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’। ১৯৮২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে বাংলাদেশের নাটক থিয়েটারের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ অভিনয় করেন। এ ছাড়া জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, কলকাতা, দিল্লি, দুবাই এবং দেশের প্রায় সবক’টি জেলায় আমন্ত্রিত হয়ে অভিনয় করেছেন।

টেলিভিশনে শত শত নাটকে অভিনয় করেছেন কাদের। প্রতিটি নাটকেই আব্দুল কাদেরের সাবলীল অভিনয় দর্শক প্রাণ ভরে উপভোগ করেছেন। তবে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে ‘বদি’ চরিত্রে অভিনয় করে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি। অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্রেও। অভিনয়ের পাশাপাশি বেশকিছু বিজ্ঞাপনের কাজও করেছেন এ সফল অভিনেতা। তবে ৬৯-এ থামতে হলো এ অভিনেতাকে। জীবন থেমে গেলেও আজীবন আব্দুল কাদের স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার রেখে যাওয়া সৃষ্টির মাধ্যমে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে