রংপুরে জাল ব্যান্ডরোলে বিড়ি ব্যবসা : প্রতি মাসে শতকোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

0
61

রংপুরের বিড়ি শিল্পের কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে বিভাগের ৮ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ব্র্যান্ডের বিড়ি বাজারজাত করে আসছেন। এতে প্রতি মাসে সরকার শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ অপকর্মের সঙ্গে কাস্টমস বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এ জন্য তারা প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ মাসোহারা পেয়ে থাকেন।

সম্প্রতি এ রকম অর্ধকোটি টাকা মূল্যমানের জাল ব্যান্ডরোলের একটি চালান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ আটক করলে আরও ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে। খোদ রংপুরের বিভিন্ন অফসেট প্রেসে এসব ব্যান্ডরোল ছাপানোর কাজ করে থাকেন অসাধু বিড়ি ব্যবসায়ীরা।

রংপুরের বিভিন্ন ছাপাখানাসহ দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল শিলিগুড়িতে এসব জাল ব্যান্ডরোল ছাপার কাজ করা হয়। দেশের সীমান্তের ওপারে ছাপানো ব্যান্ডরোল দেশে আনা হয় চোরাই পথে। আর দেশের বিভিন্ন প্রেসে ছাপানো ব্যান্ডরোল গোপনে বিড়ি কারখানায় সরবরাহ করেন প্রেস মালিকরাই। ১৯ নভেম্বর গভীর রাতে রংপুর মহানগরীর সিওবাজার এলাকায় বিনোদন স্পট ভিন্ন জগত কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন নকল সরকারি ব্যান্ডরোল তৈরির ছাপাখানা এসকে প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে ছাপানো সোয়া আটান্ন লাখ টাকার নকল ব্যান্ডরোলও উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বিনোদন কেন্দ্র ভিন্ন জগতের মালিক কামাল হোসেনের ছেলে তৌফিক হাসান তপুসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করে।

রংপুর মহানগরীর সিওবাজার এলাকায় তার মালিকানাধীন ছাপাখানা এসকে প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের ওই সরকারি জাল ব্যান্ডরোল তৈরি করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে জাল ব্যান্ডরোল ছাপিয়ে তা বিভিন্ন বিড়ির কারখানায় সরবরাহ করা হতো। এজন্য কিছু অসাধু বিড়ি ব্যবসায়ীর চাহিদামতো প্রেস থেকে জাল ব্যান্ডরোল সরবরাহ করা হতো। গ্রেফতার ব্যক্তিরা আদালতে এ বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি অ্যান্ড মিডিয়া) উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিতে রংপুরে নকল ব্যান্ডরোল তৈরির মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে বেশ কিছু ক্লু পাওয়া গেছে। যা এ সংক্রান্ত অভিযানে বড় ধরনের সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় পলাতক রবিউল ইসলামকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মাহিগঞ্জ জোন) মো. আল ইমরান হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে নিউ সাহেবগঞ্জ মজুমদার রহমানের আলুর গোডাউনের সামনে থেকে জাল ব্যান্ডরোল উদ্ধার করে পুলিশ। এসব ব্যান্ডরোলের গায়ে বিড়ি শুল্ককর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লেখা ছিল।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের মধ্যেও মহামারী করোনাকালীন সময়কে সুযোগ হিসেবে ও লকডাউনকে কাজে লাগিয়ে এ জাল ব্যান্ডরোলের হরিলুটের ব্যবসা চলে আসছে। এতে করে প্রতি মাসে শুধু হারাগাছ এলাকা থেকে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

রাজস্ব বোর্ডের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ২৫ শলাকার বিড়ির প্যাকেটের ব্যান্ডরোলে মূল্য, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, সারচার্জ ও স্বাস্থ্যখাত মিলে এক প্যাকেট বিড়ি বাজারজাতকরণে রাজস্ব খাতে ব্যয় হয় ৯ টাকা ০৯ পয়সা। আর ২৫ শলাকা বিড়ি তৈরিতে মালিকদের ব্যয় হয় কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ টাকা। সে হিসাব অনুযায়ী ১ প্যাকেট বিড়ি বাজারজাতে খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। এ কারণে সরকারিভাবে বিড়ি বিক্রির জন্য প্রতি ২৫ শলাকার ১ প্যাকেট বিড়ির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে প্রতিদিন বৈধ-অবৈধ মিলে প্রায় ১ কোটি শলাকা বিড়ি বাজারজাত হয়। এর মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ বিড়ি সরকারি রাজস্ব মেনে বাজারজাত করা হয়। বাকি ৭০ ভাগ বিড়িই জাল ও ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে বাজারজাত হয়ে আসছে।

গংগাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী আনছার আলী বলেন, আমি নকল, জাল ও ব্যান্ডরোলবিহীন বিড়ি বুঝি না। কম দামে বিড়ি ক্রয় করে ২ থেকে ৩ টাকা লাভ করে বিক্রি করি। বিভিন্ন বিড়ির মালিক নিয়মিত আমাদের দোকানে তা সরবরাহ করেন।

বাংলাদেশ বিড়ি মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও রংপুর জেলা সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, জাল ব্যান্ডরোল বিড়ি তৈরি বন্ধে আমাদের করণীয় কিছু নেই। আমরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বরাবরই এ বিষয়ে তাগিদ দিয়ে আসছি, তারা যেন অভিযান চালিয়ে এসব বিড়ি বন্ধ করে দেন।

রংপুর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট বিভাগীয় কমিশনার ড. শওকত আলী সাদী বলেন, ৯ মাসে বছরে জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করা হয়েছে। বর্তমানে যারা আইন অমান্য করছে ও রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িতের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

রংপুর জেলা প্রশাসক আসিফ আহসান বলেন, জাল ব্যান্ডরোলের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এ জন্য টাস্কফোর্স টিম গঠন করা হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে