সাংবাদিককে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে নির্যাতন: হুমকিতে নাইজেরিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

2
415
ছবিতে জোন্স আবিরি। নাইজেরিয়ার কারাগারে গরম লোহা দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ারসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন তিনি। (ছবি: জনাথন রোজেন / সিপিজে)

নাইজেরিয়ার সাংবাদিক জোন্স আবিরির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা চলছিলো। মামলার অভিযোগে তাকে জঙ্গি হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। আবিরির বিরুদ্ধে মামলাটি একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে, যা নাইজেরিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। সেই আলোচিত মামলাটি নিয়ে নাইজেরিয়ার গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র কর্তৃক মামলাটি নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে।

আগামীকাল ১২ই ডিসেম্বর জোন্স আবিরিকে আবারও ফেডারেল আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। যেখানে তাকে সন্ত্রাসবাদ, নাশকতা এবং সাইবার অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে যে তার বিরুদ্ধে নতুন সাক্ষ প্রমাণ রয়েছে, তবে তারা তাদের সাক্ষীদের নাম পরিচয় গোপন রাখতে বিচারকের কাছে অনুমতি চেয়েছে। তিন বছরেরও বেশি সময়ের বিচারে নাইজেরিয়ার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বিষয়টি রাষ্ট্র কর্তৃক স্পষ্টতো অস্বীকার করার সর্বশেষ প্রচেষ্টা এটি। নাইজেরিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্ত মত প্রকাশের তদন্তের মধ্যেই আবিরীর বিচার অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নাইজেরিয়ার বেশ কয়েকটি সাংবাদিককে কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। এমনকি অনেককে বিক্ষোভের মুখে হত্যা করা হয়েছে।

আমেরিকার বাসিন্দা ও অনলাইন পত্রিকা সাহারা রিপোর্টার্স এর প্রতিষ্ঠাতা ওমোয়েলে সোভোরকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ চলাকালে গত ৩রা আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। এখনো তাকে আটকে রাখা হয়েছে। জুনে নাইজেরিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট সিকিউরিটি (ডিএসএস) বিভাগ একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের নাম প্রকাশ না করেই গ্রেপ্তার করেছিল। ডিএসএসের মুখপাত্র পিটার আফুনান্যা তাদের পরিচয় এবং অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার কল এবং বার্তা দিলেও তার কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

জোন্স আবিরি নাইজেরিয়ার দক্ষিণ ইয়েনাগোয়া শহরে সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্যা উইকলি সোর্স ইন নাইজেরিয়ার্স এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। তখন ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তাকে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএসএস তাকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আটক করেছিল এবং দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাক্সেস ছাড়াই তাকে ধরে রেখেছিল। তার পরিবার বা কোন আইনজীবীর কাছে ডিএসএস তার সম্পর্কে কোনও তথ্য সরবরাহ করেনি। ধারণা করা হয়েছিলো যে তিনি মারা গেছেন।

অবশেষে, ২০১৮ সালের আগস্টে স্থানীয় সাংবাদিক এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আন্দোলনের ফলে তার সন্ধান দেয়া হয় এবং মামলা উত্থাপন করা হয়। পরে আবিরিকে নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজারের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। মামলায় আবিরির বিরুদ্ধে কয়েকটি সংস্থার কাছ থেকে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ আনা হয়। সরকার জানায়, তিনি একজন জঙ্গি। কিন্তু কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় মামলাটি খারিজের নির্দেশ দেয় আদালত। একইসঙ্গে একটি পৃথক আদালত নাইজেরিয়ান সরকারকে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য আবিরিকে ১০.৫ মিলিয়ন নায়রা (২৯,০০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

২০১৮ এর সেপ্টেম্বরে আবিরি নাইজেরিয়ার দক্ষিণ বায়ালসা রাজ্যে ফিরে এসে তার পত্রিকাটি আবার প্রকাশ করেন। তবে তিনি বেশি দিন মুক্ত থাকতে পারলেন না। এ বছরের মার্চে ডিএসএস তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে। এর দু’মাস পরে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এবারও একই অভিযোগে তাকে মামলা দেয়া হয়, যা ২০১৮ সালে আদালত খারিজ করেছিল। এরপর অক্টোবরের শেষদিকে আবিরিকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।
চলমান এই বিচার অবশ্য আবিরি এবং নাইজেরিয়ার জনগণ প্রথমবারের মতো আদালতের তথ্য প্রমাণগুলো দেখতে পারবে। যদি এটি গোপন করা না হয়। কিন্তু জুনে প্রসিকিউশন তাদের সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আদালতে অনুমতি চায়, এর অর্থ হলো তাদের সাক্ষীরা বেনামে থাকার অনুমতি পেয়েছে। আবিরির আইনজীবী স্যামুয়েল ওগালা বলছিলেন, বিচারক হয়তো অনুরোধটি মঞ্জুর করবেন। সাক্ষী কে বা কারা তা আবিরিকেও জানার অনুমতি দেয়া হবে না। অভিযোগকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার কোনও ক্ষমতা তাদের নেই। এমনকি বিচারক যাচাই করা ছাড়াই অভিযোগকারীর কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে।

আবির আঙ্গাটিমি কেনেথ এবং টোবোলাইফা জোন্স তার বন্দী পিতা এবং স্বামী জোন্স আবিরির সঙ্গে তার প্রকাশিত সংবাদপত্রের শেষ সংস্করণে ছবি ছাপা হয়েছিলো। ২০১৬ সালে বিনা বিচারে জোন্স আবিরি দুই বছরের জন্য কারাবন্দি হওয়ার আগে এটি প্রকাশ করেছিলেন। অবিরি ২০১৮ সালের আগস্টে মুক্তি পেয়েছিলেন, তবে মে ২০১৯ এ ফেডারেল আদালতে অভিযুক্ত হয়ে পুনরায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে অক্টোবরে জামিনে মুক্তি পান। (ছবি: জনাথন রোজেন / সিপিজে)

অক্টোবরে নাইজেরিয়ার আরেকটি পৃথক ফেডারেল আদালতের মাধ্যমে গোপনীয়তার ভিত্তিতে বিচারের সম্ভাবনা আরও সহজ হচ্ছিলো। এতে কারাগারের সাংবাদিক আগবা জালিঙ্গোর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া ব্যক্তির নাম প্রকাশ হয়নি। এমনকি সাক্ষীরা এলে আদালত থেকে জনসাধারণকে বের করে দেয়া হয়। জালিঙ্গোর আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের সাক্ষীদের উপর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। আবিরির মামলার প্রধান প্রসিকিউটর আমিনু কায়োডি আলিলু সাক্ষীর নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাইজেরিয়ার ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্য নির্বাচনের সময় দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে চেয়ে আবুজা এবং লাগোসের সাংবাদিকদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়। তারা প্রায় প্রতিটি উত্তরে আবির এবং তার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্ণনা করেন। তিনি কারাগারে কীভাবে ছিলেন? তার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হয়েছে? চিকিৎসা সেবা দেয়া এবং নাইজেরিয়ান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বলছিলেন। তারা বলেন, আবিরিকে যদি বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে রাখতো, তবে তাকে আর পাওয়া যেত না। তাকে অদৃশ্য করে দেয়া হতো।

আবিরির বিরুদ্ধে এই মামলা স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইয়ের চেয়ে বড় কিছু উপস্থাপন করে। মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার জন্য যে সাক্ষীদের আনা হয়েছে, কিন্তু নাইজেরিয়ার সাংবাদিকদের কোন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের একজন সহকর্মী কেন এত মারাত্মক নির্যাতন ভোগ করছে সে সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অস্বীকার করা হয়েছে। এভাবে কোন স্বচ্ছতা ছাড়াই আবিরীর বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা চললে নাইজেরিয়ার গণমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক নজির স্থাপন হবে।

মূল লেখা: জোনাথন রোজেন, সিনিয়র আফরিকান প্রোগ্রাম গবেষক, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস। আল জাজিরায় প্রকাশিত। >> অনুবাদ: আলতাফ হোসাইন

2 মন্তব্য

  1. It’s very straightforward to find out any topic on net as compared to books, as I found this piece of writing at
    this web site.

    P.S. If you have a minute, would love your feedback on my new website re-design. You can find
    it by searching for “royal cbd” – no sweat if you can’t.

    Keep up the good work!

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে