স্ত্রীকে বাঁচাতে রমজান আলীর যুদ্ধ

0
107

আলতাফ হোসাইন: প্রায় দুই বছর ধরে স্ত্রীর ব্রেস্ট ক্যান্সার। ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচাতে তাই রীতিমতো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য সঞ্চয় করা টাকাসহ স্ত্রীর চিকিৎসায় এরই মধ্যে শেষ করেছেন লাখ তিনেক টাকা। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে। টাকার অভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ। তবুও নিজের সবটুকু দিয়ে হলেও স্ত্রীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। যদিও স্ত্রীর প্রতি অদম্য ভালোবাসা আর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ছাড়া তার সম্বল বলতে আর তেমন কিছুই নেই।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী। পেশায় একজন রিকশাচালক। গ্রামের বাড়ি নাটোরে। ২০ বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন নরসিংদীর মেয়ে মোছা. মনি বেগমকে। বিয়ের কিছুদিন সুখেই কেটেছিল। তবে সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এমনিতেই অভাবের সংসারে নানা টানাপড়েন। এরই মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়লো, মনি বেগম ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত। পরে রমজান আলী তার স্ত্রীকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। এরপর পিজি হাসপাতাল থেকে সরকারি কর্মজীবী হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও নিয়মিত ওষুধ সেবন ও সিকিৎসা সেবার অভাবে বর্তমানে তার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডাক্তার জানিয়েছেন, মনির সিকিৎসার জন্য আরো ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার দরকার। এ অবস্থায় স্ত্রীর সিকিৎসার অর্থ যোগান দিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন রমজান আলী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের উচ্চবিত্তদের কাছে হাত পেতেছেন। তবে কারো কাছে কোনোরকম সাহায্য-সহযোগিতা তো পাননি, বরং উল্টো নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।

উপায় না পেয়ে অবশেষে গণমাধ্যমের শরণাপন্ন হয়েছেন রমজান আলী। গত বৃহস্পতিবার মানবজমিন-এর অফিসে এসে জানান তার অসহায়ত্বের কথা। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, একজন রিকশাচালক হয়ে এতো টাকা যোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব। কিছুদিন আগে বাবা মারা গেছেন তার আগে বড় ভাইয়ের একটা জটিল রোগ হয়। তিনিও মারা গেছেন। তাদের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করতে হয়েছে। আমার মা ৯ বছর ধরে প্যারালাইসিসের রোগী এরই মধ্যে আমার যা সাধ্য ছিল সেই অনুযায়ী ২-৩ লাখ টাকা খরচ করেছি। নিজের যা সঞ্চয় ছিল তাও শেষ। কিন্তু আর পারছি না। এক সময় ভালো চলতাম। ৬টা রিকশা ছিল। সেগুলো ভাড়া দিতাম। কিন্তু সব বিক্রি করে দিয়ে এখন আমি নিঃস্ব, অসহায়। ডাক্তার জানালেন, কেমো করে তারপর সার্জারি করলে আমার মনি (স্ত্রী) সুস্থ হয়ে যাবে। এজন্য আরো ৪-৫ লাখ টাকা লাগবে। এতো টাকা আমি কোথায় পাবো? কীভাবে যোগাড় করবো? তাই আমাদের স্থানীয় এমপি এবং নেতাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ আমাকে পাত্তা দেননি।

রমজান আলী আরো বলেন, বর্তমানে সব কাজকর্ম ফেলে এই টেনশন নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কি করবো? কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো? কীভাবে টাকা যোগাড় হবে- এইসব টেনশনে ঘুমাতে পারি না। রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে খাবার আর কিছু ওষুধ কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। পরিবারে এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ের বয়স ১৮ বছর। অভাবের কারণে মেয়েকে পড়াশোনাও করাতে পারিনি। এরমধ্যে আবার শুরু হয় করোনাভাইরাস। করোনার মধ্যে রিকশা চালানোও বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। এরমধ্যেই কিছুদিন আগে মেয়েকে এলাকার একটি জুতার কারখানায় কাজে দিয়েছি। মাসে ৫ হাজার টাকা পায়। ওটা দিয়ে কি আর হয়। আর ছেলের বয়স ৭ বছর। ছোট বাচ্চা ও আর কি কাজ করবে?

তিনি বলেন, সকালে রিকশা নিয়ে বের হলে হঠাৎ করে কল দিয়ে বউ কান্না শুরু করে। কারণ শরীরে অনেক যন্ত্রণা হয় তার। শরীরে একটু ম্যাসাজ করলে নাকি আরাম পায়। তাই বাসায় গিয়ে একটু ওর হাত পা টিপে দিয়ে আবার রিকশা নিয়ে বের হই। এভাবেই চলছে প্রতিদিন। অনেকে বললেন যে, খারাপ কিছু হবে না চিন্তার কিছু নেই। চিকিৎসা দিলে এই রোগ ভালো হয়ে যায়। কিন্তু দিন দিন আমার স্ত্রীর অবস্থা খারাপ হয়ে যচ্ছে। চিকিৎসা না হলে ভালো হবে কীভাবে? সবাই বলেছিল এই রোগের চিকিৎসায় কোনো টাকা লাগে না। এখন দেখছি টাকা ছাড়া কিছুই হয় না।

রমজান আলী আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ সখের বসেও কত টাকা খরচ করে। লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকার খবর শুনি। আর আমি আজ টাকার অভাবে স্ত্রীর সিকিৎসা করাতে পারছি না। অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি এতোদিন। সেও অনেক কষ্ট করেছে। এখন যদি টাকার অভাবে তার সিকিৎসা করাতে না পারি এটা আমার জন্য খুবই লজ্জার ব্যাপার। তবে আমার বিশ্বাস যে একটা উপায় বের করতে পারবো। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান রমজান আলী।

তিনি বলেন, কেউ না কেউ আমার পাশে দাঁড়াবেন। এছাড়া সবাই যদি সবার জায়গা থেকে আমাকে একটু সহযোগিতা করেন তাহলে আমার স্ত্রীকে সুস্থ করতে পারবো ইনশাআল্লাহ্‌। তাই আমি সবার কাছে দোয়া চাই এবং একটু সহযোগিতার আবেদন জানাই। আমার স্ত্রীর সিকিৎসার সব ধরনের কাগজপত্র আছে। আমার অবস্থা দেখে যাচাই-বাছাই করে একটু মানবিক দৃষ্টি দিলে, আমার মনি হয়তো আপনাদের সহযোগিতায় আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।

রমজান আলীর বর্তমান ঠিকানা: ১০/৫ মেরাদিয়া কবরস্থান রোড, খিলগাঁও, ঢাকা। মোবাইল নং: ০১৭৬২-০৪৩২২৫

সূত্র: দৈনিক মানবজমিন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে