হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য চিরচেনা পালকি!

0
102

রাজিবুল হক : পালকি  গ্রাম-বাংলায় যুগ যুগ ধরে পরিচিত একটি বাহন। পালকি বাঙালি জাতির প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম একটি নিদর্শন। বিশেষ করে বিয়ে উৎসবে পালকির কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। ৯০ দশকের শেষলগ্ন পর্যন্ত পালকি ছাড়া বিয়ে উৎসব কল্পনাই করা যেতনা। গ্রামীণ আঁকা-বাঁকা মেঠো পথে, বর-কনে পালকি চড়ে উভয়ের শ্বশুর বাড়িতে আসা-যাওয়া  ছিল এক চিরায়ত দৃশ্য । গাঁও-গ্রামের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে মন জুড়াত গাঁওয়ের বধূ, কখনও মা-চাচি, এমনকি আনন্দ উল্লাস থেকে উঠতি বয়সের চঞ্চল মেয়েরাও বাদ পড়তো না।

পালকি মানুষের ঐতিহ্যবাহী  ও প্রাচীন একটি বাহনের  নাম ।আগের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার সময়ের চাইতে  অনেক পিছিয়ে ছিল। তখন চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষজনের ভরষা ছিল বর্ষায় নাও,হেমন্তে পাও। ওই সময় বিয়েতে নতুন বধূকে আনতে পালকি চড়ে শ্বশুর বাড়ি যেতেন বর। শ্বশুর বাড়ি থেকে ফেরার সময় কনে চড়তেন পালকিতে। আর নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী গ্রাম হোকনা কেন অনেক সময়  বর পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরতেন। আবার দুজনে একসাথেও আসতেন।  বেহারার পালকি কাঁধে বহন করার দৃশ্যকাব্য ছিলো নিদারুণ সুন্দর । গ্রামের মেঁঠো পথ ধরে বেহারা গানের সুরে পালকি বেয়ে চলেছেন, চার বেহারার পালকি চড়ে, যায়রে কন্যা স্বামীর ঘরে। পালকির ভিতর থেকে নববধু উঁকি মেরে দেখছে, এ যেন এক অপরুপ দৃশ্য। কান্না ভেজা নয়ন তবু যেন নতুনত্বের এক স্পন্দন। । পালকি যখন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয় তখন কাঁচা-মাটি, কখনও আলপথ, কখনও মেঠোপথে হেঁটে এগিয়ে চলত। এ  দৃশ্যপট এক অন্যরকম  অভিজ্ঞতা ।

সাধারণত বর-কনের জন্য পালকি হলেও এক সময় এটি ছিল রাজরাজাদের একমাত্র বাহন। আগের যুগে  গাড়ির প্রচলন ছিল না বলে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা পালকিতে চড়েই যাতায়াত করত। পালকি রাজা-বাদশাদের জন্য চেয়ারের মতো করে  তৈরি করা হতো।  প্রাচীনকাল  থেকেই রাজা-বাদশারা এবং জমিদার শ্রেণী ছাড়া বেহারাদের প্রতি তেমন একটা সুনজর ছিল না, কোনো রকমে বেহারাদের জীবন ও জীবিকা চলত। সেই সময়ে স্থায়ী বেহারা রাখা ছিল খুবই ব্যয়সাধ্য ব্যাপার।

এক সময় চলনবিলের বিভিন্ন  উপজেলায়  বেহারারা বাস করতেন। কিন্তু এখন নেই বললেই চলে।  এ প্রসঙ্গে চাটমোহরের বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল মান্নান পলাশ বলেন , চলনবিলের বিভিন্ন গ্রামে আগে   চুর্নকার বা  চুনের ব্যবসায়ী ছিল।  মূলত তারাই পালকির বেহারা হিসেবে কাজ করত এবং এর সাথে জড়িত ছিল। চাটমোহরের হরিপুর ইউনিয়নে একসময় বেশি পালকি দেখা যেত। কিন্তু  বর্তমানে  পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও  প্রাচীন   ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে চলেছে।  এখন বর – কনে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে বিমান, হেলিকপ্টার ও অত্যাধুনিক নামীদামী গাড়িতে। পালকি ও বেহারাদের চাহিদা দিনে দিনে হ্রাস পেয়ে প্রায় শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ফলে জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য বেহারারা বাপ-দাদার নিয়ম প্রথা এখন আর মানছে না, তারা এখন ভিন্ন পেশায় মনোনিবেশ  করেছে । ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাহন পালকি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে প্রকৃতি থেকে একেবারে বিলীন না হলেও হয়তো কোথাও কোথাও এখনও টিকে আছে। ধারণা করে যেতে পারে বিলুপ্তির পথে। তবে এখনও মাঝে মধ্যে কোথাও কোথাও পালকি দেখা যায়।

বাংলার চিরায়ত এই ঐতিহ্য ফিরে পেতে ও  বর্তমান প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে সংস্কৃতি  মন্ত্রণালয় কর্তৃক জেলা – উপজেলায়  এর প্রদর্শন করা যেতে পারে। তাতে নতুন  প্রজন্ম বাংলার এই ঐতিহ্য  সম্পর্কে  জানতে ও উদ্বুদ্ধ হতে পারবে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে